নিহত সাগর বর্মণের পরিবার তার মৃত্যুর জন্য কারখানার কর্মকর্তাদের দায়ী করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এজাহারভুক্ত দুজন ও আরও একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। কিন্তু বৃহস্পতিবার পুলিশ তিন শিশুকে আটক করে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি এই তিন শিশুই ঘটিয়েছে। আর এ ঘটনার একমাত্র সাক্ষী নয় বছরের একটি শিশু।
অন্যদিকে, চারদিনের মাথায় এসে নিহতের পরিবারও তাদের সুর পাল্টেছে। এখন তারা বলছেন, মামলা চালানোর মতো সামর্থ্য তাদের নেই, যা সত্য সেটাই যেন বেরিয়ে আসে। আর পুরো ঘটনার পেছনে থেকে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক কলকাঠি নাড়ছেন বলে জানা গেছে। পুরো প্রক্রিয়া চলছে ‘ম্যানেজে!’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৪ জুলাই ঘটনার পর থেকেই ওই সাংবাদিক পুরো বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি অন্যদের সংবাদকর্মীদেরও ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। ঘটনার পর পুরো পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত থাকায় তিনি শুরু থেকে এ নিয়ে সরাসরি কোনও উদ্যোগ নেননি। গত ২৭ জুলাই থেকে তিনি বেশ আটঘাট বেঁধে মাঠে নামেন। এরই অংশ হিসেবে এখন তিনি নিহত সাগর বর্মণের পরিবারকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন বলে জানা যায়।
জানা গেছে, ‘ম্যানেজের অংশ’ হিসেবে সাগর বর্মণের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি তার বাবা রতন বর্মণ ও রতনের বড় ছেলে রিপন বর্মণের স্ত্রী অঞ্জনা রাণীর চাকরি বহাল রাখার কথা বলেছেন। এছাড়া রতন বর্মণের অপর দুই ছেলেকেও কারখানাতে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সে কারণেই মূলত পরিবারের কেউ কথা বলছেন না।
মামলা ও গ্রেফতার ৩
এদের মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদাকে ২৫ জুলাই সকালে গ্রেফতার করা হয়। তিনি এখন সাতদিনের পুলিশি রিমান্ডে আছেন। এছাড়া ওই রাতেই এজাহারভুক্ত আসামি মিলের সিনিয়র উৎপাদন কর্মকর্তা আজাহার ইমাম ওরফে সোহেলকে (৩৮) র্যা ব-১১ আটক করে। এ বাদে ২৫ জুলাই পুলিশ লাইনম্যান সোহাগ হোসেন হৃদয়কে (৩৫) গ্রেফতার করে।
বুধবার ২৭ জুলাই তাদের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এ তিনজন এখন রূপগঞ্জ থানা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন।
পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার ৩
সাগর বর্মণকে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার ঘটনায় কোনও ষড়যন্ত্র হয়নি বরং আরও তিন শিশুর সঙ্গে খেলার ছলেই তারা ‘দুষ্টুমি’ করে সাগর বর্মণের পায়ুপথ ও মুখে কম্প্রেসারের পাইপ দিয়ে হাওয়া দেওয়ার কারণে সে মারা যায়, এমনটাই দাবি করেছেন জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিউদ্দিন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন।
পুরো বিষয়টি সত্য প্রমাণিত করতে নয় বছরের এক শিশু ঘটনার সাক্ষী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সংবাদ সম্মেলনে চারজনের কাউকেই হাজির করা হয়নি।
আটক তিন শিশু রাকিব (১২), সোহেল (১৩) ও আকাশ (১২) জোবেদা টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের শ্রমিক। তারা সাগর বর্মণের সঙ্গেই কাজ করতো।
পুলিশ সুপার জানান, শিশুদের যেভাবে জিজ্ঞাসাবাদের আইন রয়েছে, সেটা মেনেই তিনজন শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদে তারা বেশ কিছু তথ্য জানায়। এতে জানা গেছে, সাগর বর্মণের সঙ্গে আটক তিন শিশু কাজ করতো। গত ২৪ জুলাই কারখানার ভেতরে দুপুরে খেলার ছলেই হঠাৎ করে তিন শিশু মিলে সাগরের মুখে ও পায়ুপথে কম্প্রেসার মেশিনের বাতাস ঢুকিয়ে ফেলে। ওই ঘটনায় নয় বছরের এক শিশুকে আটক করা হয়েছে, যে পুরো ঘটনার সাক্ষী। তবে তদন্ত ও নানা কারণে ওই সাক্ষীর নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, এটা কি নিছক খেলার ছলের ঘটনা নাকি পরিকল্পিত, সেটা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারখানায় শিশুশ্রমের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
জোবেদা টেক্সটাইলে বন্ধ হয়নি শিশুশ্রম
২৪ জুলাই সাগর বর্মণের মৃত্যুর পর জোবেদা টেক্সটাইল মিলে শিশুশ্রম আইন অমান্যের বিষয়টি দৃষ্টিগোচরে আসে পুলিশ প্রশাসনের। ২৫ জুলাই দুপুরে রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কারখানা থেকে ২৪ জন শিশুশ্রমিককে উদ্ধার করে। ২৬ জুলাই সাগর বর্মণ হত্যার ঘটনায় কারখানার চেয়ারম্যান আজাহারুল ইসলাম ভূঁইয়া ও এমডি লায়ন মীর আব্দুল আলিমের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের পরিদর্শক সামিউল আলম কুরশী।
এতে শ্রমআইন লঙ্ঘন, নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণেরও আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া এর আগে শ্রমআইন লঙ্ঘনের অভিযোগে শ্রমআদালতে আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে এরপরেও থেমে নেই কারখানাটিতে শিশুশ্রম। বরং প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কারখানাটির মালিকপক্ষ শিশুশ্রম অব্যাহত রেখেছিল যার প্রমাণ মিলেছে ঘটনার পাঁচদিন পরেও কারখানাটিতে শিশুশ্রমিকরা কর্মরত ছিল।
বৃহস্পতিবার ২৮ জুলাই ওই কারখানা থেকেই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন শিশু শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়। কারখানার শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, যাত্রামুড়া এলাকায় একই কম্পাউন্ডের মধ্যে জোবেদা টেক্সটাইল মিল, এখলাস স্পিনিং মিল ও আজাহারুল স্পিনিং মিল নামে তিনটি কারখানা অবস্থিত। কারখানা তিনটির মোট সাতটি সেকশন রয়েছে, যেখানে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ৪০০ থেকে ৫০০ শিশুশ্রমিক রয়েছে। এদের বয়স ১৮ বছরের চেয়েও কম। এসব শ্রমিকদের ওপর প্রায় সময়ই কারখানা কর্তৃপক্ষের লোকজন নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। নিহত সাগর বর্মণের এর আগেও একবার মাথা ফেটেছিল।
দালালের মাধ্যমে কাজ করতো তিন শিশু, রয়েছে আরও
বৃহস্পতিবার সরেজমিন কারখানার বাইরে কথা হয়, বেশ কয়েকজন শিশুশ্রমিকের সঙ্গে। তবে চাকরির স্বার্থে তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। ১০-১২ জন শিশুশ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
তারা জানায়, কারখানায় দুই শিফটে অনেক শিশু কাজ করে। কিন্তু তাদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। এসব শিশুশ্রমিকদের বেতন দুই থেকে তিন হাজার টাকা। তারা বড়দের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে। যেমন- টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলে তুলা বাছাই করা, কাপরের সুতা ওঠানো, সুতার বস্তাবন্দি থেকে শুরু করে আরো অনেক কাজ। এসব কাজ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তুলায় প্রচুর পরিমাণে ডাস্ট বা ধুলাবালি থাকে। কিন্তু কোনও শ্রমিককে মাস্ক দেওয়া হয় না। ঝুঁকি নিয়েই তারা কাজ করে।
ওই শিশুশ্রমিকরা আরও জানায়, তাদের কাজের জন্য কন্ট্রাক্টর আছে। কারখানাতে ১০-১২ জন কন্ট্রাক্টর আছে, যাদের অধীনে তারা কাজ করে। আর তাদের বেতন মূলত ওই কন্ট্রাক্টররাই নিয়ে নেয়। সেখান থেকে তারা মাস শেষে বেতন পায়। কেউ দুই হাজার, কেউ পায় ২২শ টাকা। তাদেরকে আবার থাকার ব্যবস্থা করে দিতো ওই সব কন্ট্রাক্টর। কারখানার আশেপাশে কোনও মেসে থাকে তারা। সেখানে খাওয়া ও থাকা বাবদ আরও দেড় হাজার টাকা চলে যায়। মাস শেষে একেকজন শিশুশ্রমিকের পকেটে থাকতো মাত্র ৬ থেকে ৭শ টাকা। অথচ দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয় তাদের।
তবে নিহত সাগর বর্মণ পেতো তিন হাজার একশ টাকা। তার বাবা ও বড় ভাইয়ের স্ত্রী কারখানাতে কাজ করতো। সে কারণেই সরাসরি কারখানাতে ঢোকার কারণে কন্ট্রাক্টরের শরণাপন্ন হতে হয়নি তাকে।
আটকের পর থানায় নিয়ে রাখাতে সন্দেহ বাড়ছে
এদিকে, আটক তিন শিশুর পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। কারণ, আটক রাকিবের (১২) বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল এলাকার জাহাঙ্গীরপুর এলাকায়। তার বাবার নাম রিটন। আকাশ (১২) একই জেলার করিমগঞ্জ থানার গুজাইদা নামাপাড়া এলাকার হক মিয়ার ছেলে। আর সোহেল (১৩) নরসিংদী জেলার কাজীকান্দি এলাকার আবদুল হান্নানের ছেলে। বৃহস্পতিবার আটকের পর তাদের তিনজনকে দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আনা হয়। পরে সেখান থেকে আবারও নেওয়া হয় থানাতে। সেখানেই পুলিশ সদস্যরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপগঞ্জ থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি বেশ স্পর্শকাতর। সে কারণেই বৃহস্পতিবার তিনজনকে আদালতে নেওয়া হয়নি। শুক্রবার তাদের আদালতে নেওয়া হবে। তখন তাদের কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হবে। এছাড়া আটক সাক্ষীরও জবানবন্দিও নেওয়া হবে। সে কারণেই তাদের আদালতে গিয়ে কী কী বলতে হবে, তা শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আগের বক্তব্য থেকে সরে এসেছে সাগর বর্মণের পরিবার
তিনি জানিয়েছেন, আমি এখন মামলা লড়তে চাই না। কারণ, মামলা লড়ার মতো টাকাপয়সা আমাদের নেই। সাগর মারা যাওয়ার পর লাশ মর্গ থেকে আনতে মানুষ টাকা দিয়েছিল। ওই টাকা দিয়েই লাশ আনতে হয়েছিল। এখন মামলা লড়বো সেই টাকাও নেই।
তিনি জানান, মামলার পর টাকা দিতে না পারায় তিনি কোনও আইনজীবী পাননি।
তবে এখন অনেকেই তার কাছে গিয়ে মামলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চাইলেও তিনি মামলা লড়তে রাজি নন।
ঘটনার পর রাতে পুলিশের একজন কর্মকর্তা তার কাছ থেকে টিপসই নিয়ে গেছেন। পরে জানতে পেরেছেন ওটাই মামলার কপি।
তিনি আরও বলেন, আমি কাজ করার সময় ছেলে ফ্লোরে পড়ে থাকে। তখন আশেপাশে যাদের দেখতে পেয়েছি, তাদের নামই বলেছি। পরে শুনেছি, তাদের আসামি করা হয়েছে।
রতন বর্মণ বলেন, আমিও ওই কারখানাতেই কাজ করি। এখন যদি স্যারদের বিরুদ্ধে মামলা চালাই, তাহলে তো আমাদের চাকরিও থাকবে না।
এদিকে, সাগরের বড় ভাই রিপন বর্মণের স্ত্রী অঞ্জনা রাণী বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইল ফোনে বলেন, আমাদের এখন কিছু ক্ষতিপূরণ দিলেই চলবে। কারণ, মামলা চালানোর টাকা নেই। আমিও কারখানাতে কাজ করি। আমার শ্বশুরও করেন। আর সাগরও করতো। ও তো মারাই গেছে। এ তিনজনের টাকা দিয়েই সংসার চলতো। এখন মামলা করতে গেলে আমাদের সংসারে আরও বিপদ আসতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ জুলাই ঘটনার পর থেকে কারখানাতে কাজ করা রতন ও তার ছেলেবউ অঞ্জনা কাজে যোগ দেননি। শনিবার ৩০ জুলাই থেকে তারা কাজে যোগ দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুরো পরিবারটিই হতদরিদ্র। নেত্রকোনায় থাকতে মূলত মাছ ধরেই তাদের সংসার চলতো। সাগরের বড় দুইভাই এখনও নেত্রকোনায় মাছ ধরেন। তাদেরকেও জোবেদা কারখানাতে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব কারণেই তারা এখন এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনও ধরনের দ্বন্দ্বে জড়াতে চাইছেন না।
/এসএ/এবি/