প্রশ্ন করতে এসে প্রশ্নবাণে জর্জরিত পুলিশের ডিআইজি

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভায় পুলিশের ধাওয়ায় পুকুরের পানিতে ডুবে পান দোকানদার আবদুল মতিন ও পুলিশের কনস্টেবল আরিফুজ্জামান আরিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এলাকাবাসীর প্রশ্নে জর্জরিত হলেন পুলিশের একজন উপ-মহাপরিদর্শকসহ (ডিআইজি) স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা।

শনিবার সকাল ১১টায় পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আলী মিয়া তদন্তের জন্য সময়ে এলাকাবাসী তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। তার মধ্যে মামলায় আবদুল মতিনকে কেন মাদকাসক্ত উল্লেখ করা হয়েছে- তা জানতে চান। নারায়ণগঞ্জসাদা পোশাকে কেন পুলিশ ঘটনাস্থলে গেল এ প্রশ্নও করেন। আবদুল মতিন নিছক একজন পান দোকানদার ও থানায় কোনও মামলা না থাকার পরও, মামলার এজাহারে কেন তাকে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী উল্লেখ করা হলো, এ প্রশ্নকে সামনে রেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। এছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশ কেন অভিযান চালায়, সে প্রশ্ন করলেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্ট হয়। পরে পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ নিরীহ কাউকে হয়রানি করলে তাকে গ্রেফতার হবে, এ প্রতিশ্রুতি দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি (অপরাধ) মোহাম্মদ আলী মিয়া সোনারগাঁও পৌরসভার রাইজদিয়া গ্রামে দিয়ে গত ২ আগস্ট নিহত দুইজনের মৃত্যুর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে স্থানীয় সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর জায়েদা আক্তার মনির বাড়ির উঠানে এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এলাকাবাসী পুলিশদের জানান, এর আগেও এএসআই ফখরুল ইসলাম নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। এসব কারণে তাকে তাজমহল এলাকা থেকে প্রত্যাহারও করে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর কারণেই মূলত ২ আগস্ট দুইজনের প্রাণ গেছে। একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর গ্রামের নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা ঠুকে দেওয়া সঠিক হয়নি। তাছাড়া আবদুল মতিনকে মাদক বিক্রেতা বানানো পুলিশের উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো কাজ।

প্রশ্ন একের পর এক করতে থাকলে পুলিশ সদস্যরা বেশ বিব্রত বোধ করেন। নিহত আবদুল মতিনের স্ত্রী নূরতাজ বেগম ও মেয়েরা পুলিশকে জানান, মামলার কারণে তার পরিবারের পুরুষেরাও জানাযাতে অংশ নিতে পারেনি। মতিনের একমাত্র ছেলে জোবায়েরও বাড়ির বাইরে।

নিহত পরিবারের এক আকুতিতে সেখানে লোকজন হৈ চৈ শুরু করে এবং ঘটনার জন্য পুলিশকেই দায়ী করে স্লোগান দিতে থাকে। পরে পুলিশের ডিআইজি এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, পুলিশ নিরীহ কাউকেই হয়রানি করবে না। তদন্ত করে যদি কোন পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণ হয় তাহলে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না। মামলায় মতিনকে ‘মাদকাসক্ত’ প্রসঙ্গে ডিআইজি বলেন, এটা আমরা দেখবো। অহেতুক কাউকেই এখানে হয়রানি করা হবে না।

সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের তদন্ত পাঠানো নিয়ে ডিআইজি সবার সামনেই সোনারগাঁও থানার ওসি মঞ্জুর কাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। এছাড়া এএসআই ফখরুলের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগগুলো আগে কেন খতিয়ে দেখা হয়নি সেটাও জানতে চাওয়া হয়।

সোনারগাঁও থানার ওসি মঞ্জুর কাদের জানান, ডিআইজি স্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমরাও এলাকার লোকজনদের ঘরে গিয়ে নিশ্চিত করেছি যে কাউকে অহেতুক হয়রানি করা হবে না। গ্রাম ছাড়া পুরুষেরা যাতে ফিরে আসে।

২ আগস্ট আবদুল মতিন ও কনস্টেবল আরিফুজ্জামান আরিফের মৃত্যুর ঘটনার পরদিন ৩ আগস্ট পুলিশের সহকারী পরিদর্শক (এস আই) আলামিন তালুকদার বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ সহ অজ্ঞাত ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। ওইদিন ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে মতিয়ার রহমান ও ফোরকান শিকদার সহ পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক (তদন্ত) মামুনুর রশিদ মণ্ডল রয়েছেন।

তদন্তকারী দলে ডিআইজির সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মতিয়ার রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) ফোরকান শিকদার, সোনারগাঁও থানার ওসি মঞ্জুর কাদের প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত ২ আগস্ট বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার রাইজদিয়া গ্রামে আবদুল মতিন নামের এক পান দোকানদারকে মাদক বিক্রেতা আখ্যা দিয়ে ধাওয়া করলে সে স্থানীয় একটি পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায়। পরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পুলিশের কনস্টেবল আরিফুরকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। পুলিশ আবদুল মতিনকে মাদকাসক্ত উল্লেখ করে মামলা করেন। ময়না তদন্তের রিপোর্টে দুইজনেরই মৃত্যু আঘাতজনিত কারণে হয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে।

/এইচকে/

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে পান দোকানদার ও পুলিশ নিহত: এএসআই সাময়িক বরখাস্ত