শামীম ওসমানের ফাঁকা আওয়াজ!

শামীম ওসমান‘শনিবার থেকে দেখবেন আওয়ামী লীগের তেজ, বিএনপিকে তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না।’ একদিন আগে শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) এমন ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান। পরদিন শনিবার সকাল থেকে তাই এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখার অপেক্ষায় ছিল নারায়ণগঞ্জবাসী। কারণ শামীম ওসমান প্রায়ই বিভিন্ন সভা সমাবেশে বলে থাকেন, ‘আমি ডাকলে লাখো জনতা কয়েক দিনেই সমবেত করতে পারি, এক ঘণ্টায় হাজার হাজার নেতাকর্মী জমায়েতের ক্ষমতাও আমার আছে।’ কিন্তু তার বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেনি শনিবার। শামীম ওসমানের বক্তব্যের পর অনেকেই অনুমান করেছিল যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই থাকবে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের মাঠ। কিন্তু বাস্তবে ছিল তার একেবারেই ভিন্ন চিত্র। বরং শনিবার সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহর ও সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকায় দোর্দণ্ড দাপটে নির্বাচনি মাঠ কাঁপিয়েছে বিএনপি।

শনিবার সকাল থেকেই বিএনপির দাপট ছিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনি এলাকাতে। কেন্দ্রীয় নেতাদের পদভারে মুখরিত ছিল পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা। বিপরীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে তেমন কোনও আগ্রহ দেখা যায়নি। যদিও নেতারা বিচ্ছিন্নভাবে গণসংযোগ করেছেন। ফলে শামীম ওসমানের শুক্রবারের দেওয়া ঘোষণার আদৌ কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে সেটা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। শুধু কী রাজনৈতিক কারণে, নাকি সত্যিকার অর্থেই সেলিনা হায়াৎ আইভীর জন্য শামীম ওসমান  মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করবেন সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে অনেকের মনে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শনিবার সকাল ৯টা থেকেই শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় জেলা বিএনপির কার্যালয়মুখী ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের স্রোত। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের পাশাপাশি মহানগরের বাইরে ফতুল্লা, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার থেকেও প্রচুর নেতাকর্মী এসে সমবেত হয় কার্যালয়ের সামনে। বেলা ১১টায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে যখন কার্যালয়ের সামনে আসেন, তখন শহরের প্রধানতম বঙ্গবন্ধু সড়কের পশ্চিম পাশে যান চলাচল বন্ধ ছিল। ১২টার দিকে মির্জা ফখরুলে নেতৃত্বে মিছিল বের হয়ে দুই নং রেল গেটস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দিয়েই শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জে যান বিএনপির মহাসচিব। এছাড়া রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপিকে বেশ কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন শামীম ওসমান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের একটি বক্তব্যের রেশ ধরে বিএনপির প্রতি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। ‘নৌকা শীতলক্ষ্যায় ডুবে যাবে’ এমন বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ ঝরে পড়ে শামীম ওসমানের কণ্ঠে। তিনি সাফ বলে দেন, ‘নৌকা ডুববে না, বরং বিএনপিকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থীদের বলতে চাই, ধানের শীষ প্রতীক আপনাদের আর রাখা উচিত না। আপনারা প্রতীক বদলান। কারণ আপনারা যখন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন এই বাংলাদেশের কৃষক ধান চাষের সারের জন্য মরেছে। বিএনপির নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন আইভীর নৌকা ডুবে যাবে। আবার কখনো বলেছেন আইভীর ভাঙ্গা নৌকা। এটা খুব দুঃখজনক। উনারা হয়তো ভুলে গেছেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের জন্মস্থান। মনে রাখতে হবে এটা আইভীর নৌকা না, এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নৌকা, বঙ্গবন্ধুর নৌকা, আওয়ামী লীগের নৌকা। নৌকা যখন ডুবানোর কথা হয় তখন আমাদের মাথায় রক্ত উঠে যায়। আগামীকাল (শনিবার) থেকে টের পাবেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কী তেজ!  আইভীর বিজয় সুনিশ্চিত করা আমাদের পক্ষ থেকে হবে আইভীর জন্য সারপ্রাইজ। আর এ বিজয় কনফার্ম। আগামীকাল থেকে প্রতিটি অলিতে-গলিতে মানুষের পায়ে হাত দিয়ে আমার নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে ভোট চাইবে।’

তবে শামীম ওসমানের এমন ঘোষণার পরদিন শনিবার সকাল থেকে শহরের দুই নং রেল গেটস্থ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখা যায়নি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাইকে বেলা ১২টায় অল্প সময়ের জন্য দেখা গেছে। তবে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান দিপু ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাতকে দেখা গেছে।

শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের ১৯নং ওয়ার্ডের মদনগঞ্জ, শান্তিনগর এলাকায় নৌকার পক্ষে প্রচারণা চালান আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান নওফেল, ২৫ নং ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা। কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলিও প্রচারণা করেন। সকালে আইভী ৯নং ওয়ার্ড এলাকায় গেলে সেখানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান, সহ-সভাপতি মোঃ সাদেকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা বদিউজ্জামান বদু প্রমুখ উপস্থিত হন।

এদিকে সকাল থেকে শামীম ওসমানের অনুগামী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাবিব আল হাসান পলু বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। শনিবার সকাল থেকে বিকেল অবধি আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, জাতীয় শ্রমিক লীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশ, মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আশরাফুননেছা, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদা বেগম, সদস্য সোহেলা পারভীন রানু, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রফেসর ড. শিরীন বেগম, ফতুল্লা থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পিয়ারী চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ গণসংযোগ করেন।

তবে শামীম ওসমানের অনুগামী হিসেবে পরিচিতি জেলা যুবলীগের সেক্রেটারি আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান রিয়াদ, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নাজমুল আলম সজল ও সেক্রেটারি জুয়েল আহমেদকে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যায়নি। অথচ তারাই শামীম ওসমানের পক্ষে হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে সমবেত হন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট একজন নেতা জানান, শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান দৃপ্ত কণ্ঠে নৌকার পক্ষে সবাইকে কাজ করার কথা বললেও কার্যত তিনি নেতাকর্মীদের ডেকে কোনও নির্দেশনা দেননি। মূলত সে কারণেই শনিবার শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট কেউ প্রচারণায় নামেননি। তারা শামীম ওসমানের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।

ওই নেতা আরও জানান, শুক্রবার শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের সামনে নৌকা ও আইভীর পক্ষে কথা বলার পর নেতাকর্মীদের আলাদা নির্দেশনা দিলে  শনিবার হয়তো বিএনপিকে রাজপথে তেমনভাবে দেখা যেত না। মূলত শামীম ওসমানের লোকজনদের পিছুটানের কারণেই বিএনপি এখনো রাজপথে আছে। 

এদিকে শামীম ওসমানের শুক্রবারের সেই সংবাদ সম্মেলন নিয়েও ঘটেছে নানা ঘটনা। ওই সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান আইভীকে দুটি শাড়ি উপহার দিতে যাচ্ছেন বলে জানান। শাড়ি দুটি গণমাধ্যমের সামনে তুলেও ধরা হয়। শুক্রবার রাতেই শাড়ি দুটি আইভীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে আইভীকে একাধিকবার ‘ছোট বোন’ বলে সম্বোধন করেন শামীম ওসমান। আইভীর প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকতাও ছিল তার কণ্ঠে। পরদিন শনিবার আইভীও তার একটি বক্তব্যে শামীম ওসমানকে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা

বলেন, ‘আমরা শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বন্দরে গণসংযোগ করেছি। আমাদের সবার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সবাই নৌকার পক্ষে নামবেন। এটা আমাদের নেতা শামীম ওসমান ঘোষণা দিয়েছেন।’ 

মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকা জিএম আরাফাত জানান, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে ৮ থেকে ৯টি টিম নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে নৌকার পক্ষে গণসংযোগ করেছেন। প্রতিদিন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতারা থাকছেন। সবাই যার যার মত কাজ করছেন। সবাই একত্রিত না হওয়ার কারণেই বোধহয় কর্মযজ্ঞ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন- 

নাসিক নির্বাচনে বিরোধ নিষ্পত্তিতে অভিনব কৌশল আ.লীগের



/এএআর/ আপ-এফএস/