স্থানীয়রা জানান, সিটি করপোরেশন ও সংসদ নির্বাচনগুলোর আগে এই সেতুকেই প্রধান ইস্যু বানানো হতো বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই সেতুর ইস্যুতে জোর দিত জনমত টানার জন্য। ১৯৯১ সাল থেকে পরের সংসদ নির্বাচনগুলোতে (১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮) নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের প্রার্থীরা প্রায় প্রত্যেকেই নির্বাচনি প্রচারণায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু গত ২৫ বছরেও সেই সেতু দৃশ্যমান হয়নি। সর্বশেষ গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেও প্রধান দুই দলের প্রার্থীর কণ্ঠে সেতু নির্মাণের আশ্বাস ছিল।
নারায়ণগঞ্জের অবহেলিত জনপদ হিসেবে শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড় বন্দরকে অনেক সময় উল্লেখ করা হয়। বন্দর উপজেলা প্রশাসনের ওয়েব পোর্টাল থেকে জানা যায়, এখানে মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৮৪১ জন। তবে সেখানে রয়েছে শতফুট চওড়া সড়ক, পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সহ আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। আক্ষেপ ছিল শুধু সেতুর জন্য। তবে অবশেষে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে চীনা কোম্পানি সিনো হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের সেতু নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর আগে ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও মাঝে অনেক জটিলতায় কাজ থমকে যায়। তবে এখন আর কোনও বাধা রইলো না।
সেতু নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল সাংবাদিকদের জানান, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটি হবে ১২৯০ মিটার। যার মধ্যে ৪০০ মিটার হচ্ছে মূল সেতু এবং ৮৯০ মিটার হচ্ছে রাস্তার দুপাশের ভায়াটেক্ট। সেতুটি হবে চার লেন বিশিষ্ট, সঙ্গে থাকবে জনসাধারণের পায়ে হাঁটার জন্য ফুটপাত ও রিকশা চলার জন্য পৃথক লেন। মদনগঞ্জ পয়েন্টে মার্চ মাস থেকে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে। ২০২০ সালের মার্চ মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান হাবিব জানান, ‘জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে দুটি সেতুর পরিকল্পনা রয়েছে। সিটি করপোরেশনের বন্দরের নবীগঞ্জ হতে শহরের হাজীগঞ্জ খেয়াঘাট নিয়ে ৯৪০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু হবে চার লেনের। এর মধ্যে নবীগঞ্জ অংশে থাকবে ২৮০ মিটার, নদীর মাঝখানে থাকবে ৪২০ মিটার ও হাজীগঞ্জ এলাকায় থাকবে ২৪০ মিটার। চার লেনের সেতুর দুই লেন দিয়ে মানুষ পারাপার হবে। আর বাকি দুই লেন দিয়ে যানবাহন চলবে। সেতুটি নির্মাণ করতে খরচ পড়বে প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা। সেতু নির্মাণের যে তিনটি ধাপ পেরুতে হয় সেগুলো এখন করা হচ্ছে। আরও একটি সেতুর পরিকল্পনা আছে। সেটা হলো শহরের ৫নং খেয়াঘাট এলাকায়। প্রায় ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই সেতুর সব দাফতরিক কাজ প্রায় শেষ। এখন শুধু সরকার অনুমোদন দিলেই কাজ শুরু হবে।’
বন্দরবাসীর স্বপ্নপূরণ
বন্দর উপজেলার সাবদিতে বাড়ি মামুন হোসেনের। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করেই নারায়ণগঞ্জ শহরে আসা যাওয়া তার। বেশ আক্ষেপ করেই বললেন, ‘বাড়ি থেকে নৌকার ঘাটে আসতে সময় লাগে ১৫ মিনিট, আর মোটরসাইকেল কষ্ট করে নৌকায় তুলে নদী পার হতে সময় দিতে হয় কমপক্ষে আধাঘণ্টা। যেতেও হয় একই পন্থায়। এখন সেতু হচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে আশা করছি। তবে সেটার বাস্তবায়ন চাই।’
বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকার কায়সার বলেন, ‘তিনটি সেতু এখনও অকল্পনীয়। তবে সেটা বাস্তব হলে বদলে যাবে পুরো চিত্র। তখন বন্দর আরও আধুনিক হবে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থাই হবে বন্দরের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।’
শহরের খানপুর এলাকার সাইফুউদ্দিন জানান, বন্দরে তিনি জায়গা কিনেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তিনি সেখানে বসতি নির্মাণ করতে পারেনি। তবে এবার সেতু নির্মিত হলে তিনি সেখানে বসতি গড়বেন।
সেতু নিয়ে আগের আশ্বাস
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বন্দরবাসীকে শীতলক্ষ্যা সেতুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হন বিএনপির সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তবে তিনি প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন এস এম আকরাম। তবে তিনিও কিছুই করতে পারেননি।
বিগত বিএনপি সরকারের শেষের দিকে সেতু নির্মাণের কোনও সম্ভাব্যতা যাচাই ও ফান্ড জোগাড় না করেই ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শহরের নবীগঞ্জ খেয়াঘাট এলাকায় সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে সেটা ছিল নিছক নির্বাচনি প্রচারণা। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও সেতুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচনের ২০১১ সালের ২০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তিনি মদনগঞ্জে সমাবেশ করে দ্রুত সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘শীতলক্ষ্যা সেতুর পাশাপাশি মদনগঞ্জের শান্তিরচরেও উন্নয়ন হবে। এটি একটি বৃহৎ শিল্পনগরীতে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিরচরের জায়গাটি বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেইজা) কাছে হস্তান্তর করেছেন যেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে।’
/এফএস/
আরও পড়ুন-
বইমেলায় শিশুদের বই নিয়ে অনেক প্রশ্ন