ওসি জানান, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ১৭ মিনিটে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মুফতি হান্নানের লাশ কোটালীপাড়া উপজেলার হিরণ গ্রামে নিয়ে আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় মুফতি হান্নানের বড়ভাই মাওলানা আলিউজ্জামান মুন্সী লাশ গ্রহণ করেন।
ভোর ৫ টা ৩৫ মিনিটে বাড়ির পাশে হিরন বালিকা মাদ্রাসা ও এতিম খানা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মুফতি হান্নানের বড়ভাই মাওলানা আলিউজ্জামান মুন্সী জানাজা পড়ান। এরপর ভোট ৫টা ৪৫ মিনিটে লাশ পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়। এ সময় কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিলাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
কোটালীপাড়া থানা ওসি মো. কামরুল ফারুক বলেন, ‘জানাজায় মুফতি হান্নানের পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে ৩১ জন অংশ নেন। লাশ দাফনের পর কোটালীপাড়া উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।’
এর আগে বুধবার রাত ১০টায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় মুফতি হান্নানসহ তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাত বারোটার পর অ্যাম্বুলেন্সযোগে তার লাশ কাশিমপুর কারাগার থেকে বের করে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার উদ্দেশে রওয়ানা হয়।
উল্লেখ্য, সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)- এর মাজার প্রাঙ্গণে ২০০৪ সালের ২১ মে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপরে গ্রেনেড হামলা করে হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা। এ ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরীসহ ৭৬ জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন। পরে পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি হাসপাতালে মারা যান।
পুলিশ ওই দিনই সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলায় ৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন হান্নান ও বিপুল। আর রিপনের পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রায়েও ওই তিন আসামির সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ওই তিন জঙ্গির আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি মুফতি হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) শুনানি শেষে চলতি বছরের ১১ ফেব্র“য়ারি রায় দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। তাতে আসামিদের আপিল খারিজ হয়ে যায়। ফলে মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং দু’জনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল থাকে।
এরপর রায় পুনর্বিবেচনার আপিলও খারিজ হয়ে গেলে গত ২১ মার্চ তাদের মৃত্যু পরোয়ানা কারাগারে পাঠানো হয়। সবশেষে ছিল কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা। সেটিও ১০ এপ্রিল প্রত্যাখ্যাত হলে কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর করা হয়।
এদিকে কাশিমপুর কারাগারে বুধবার রাতে মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর কোটালীপাড়া উপজেরার হিরন ইউনিয়নের মাঝবাড়িতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের করা হয়। পরে হিরন ইউপি চেয়ারম্যান মুন্সী ইবাদুল ইসলামের বাড়ি থেকে হিরনবাসীর উদ্যোগে আরও একটি মিছিল বের করা হয়।
আরও পড়ুন: মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর
/এমএনএইচ/