‘এখন শুধু নিজের হাতে ছেলের দাফনটা করতে চাই’

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজবাড়ীর চার প্রবাসী বাংলাদেশিতিন ছেলের মধ্যে কোব্বাত সবার ছোট। সাড়ে পাঁচ মাস আগে ধার-দেনা করে ওকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলাম। বৃহস্পতিবার রাতের ৮টার দিকে ফোন করে বলে, ‘আব্বা, নতুন একটা কাজের জন্য যাচ্ছি। আগের কাজে বেতন কম। আমার জন্য দোয়া করবেন।’ পরের দিন রাতে সৌদি আরব থেকে ভাতিজা শামীম ফোন করে জানায়, কোব্বাত আর নাই। অ্যাকসিডেন্ট কেড়ে নিয়েছে আমার কোব্বাতকে। ছেলেকে তো আর পাবো না। এখন শুধু ছেলের লাশটা নিজের হাতে দাফন করতে চাই।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্না ধরে রাখতে পারছিলেন না কোব্বাতের বাবা ওসমান খান। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নাছের মাতুব্বর পাড়ায় বাড়ি তার। বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) দিবাগত মধ্যরাতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছয় বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে একজন তার ছেলে কোব্বাত। ওসমান খানের মতো সন্তান আর স্বজনদের হারানো অন্যরাও এখন কেবল প্রিয়জনদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আহাজারি করছেন। তাদের সবার প্রত্যাশা, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।
শনিবার (২৯ জুলাই) বিকালে গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারগুলোতে এখন শুধুই কান্নার রোল। প্রিয়জনের মুখটি শেষবারের মতো দেখতেই যেন তাদের সব আকুতি। সৌদি আরবের ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন— রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের দরাপের ডাঙ্গা গ্রামের ওয়াহেদ আলী ব্যাপারীর ছেলে এরশাদ ব্যাপারী (৩০) ও তার আপন ছোট ভাই হুমায়ুন ব্যাপারী (২৫), একই ইউনিয়নের নাছের মাতুব্বর পাড়ার ওসমান খানের ছেলে কোব্বাত খান (২৫) ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের আনছার মাঝি পাড়ার ছহের মণ্ডলের ছেলে মিরাজ মণ্ডল (২২)।
কোব্বাতের পরিবারে চলছে শোকের মাতমনিহত এরশাদ ও হুমায়ুন ব্যাপারীর ছোট বোন শাহনাজ ব্যাপারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরশাদ ভাই নয় বছর হলো সৌদি আরবে কনস্ট্রাকশনে শ্রমিকের কাজ করেন। গত বছর নভেম্বরে ছোট ভাই হুমায়ুনকেও নিয়ে যান। ডিসেম্বর মাসে এরশাদ ভাই দেশে এসে বিয়ে করেন। চার মাস আগে আবার চলে যান।’
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে এরশাদের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ যোগাযোগ হয় বলে জানান শাহনাজ। তিনি বলেন, ‘এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে দুই ভাই কাজের উদ্দেশ্যে দাম্মাম থেকে আলজুব আরার দিকে রওনা দেবেন বলে জানান। পরে শুক্রবার (২৮ জুলাই) রাতে ৯টার দিকে ভাইয়ের সহকর্মী লিটন ও মালেক আমাদের ফোন দেন। জানান, এরশাদ ও হুমায়ুন ভাই অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন।’
একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় হয়ে গেছেন এরশাদ ও হুমায়ুনের মা নুরজাহান বেগম। বিলাপ করতে করতে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তিনি।
এদিকে, মেহেদীর রঙ না শুকাতেই স্বামীকে হারিয়ে এরশাদের স্ত্রী শিউলী বেগমও (১৮) পাগলপ্রায়। বিলাপ করতে করতে শিউলী বেগম বলেন, ‘শেষবার যখন কথা হয়, ও আমাকেই সাবধানে থাকতে বলেছিল। আরও বলেছিল কোরবানির ঈদে দেশে আসবে। এখন জানিই না, শেষবারের মতো ওর মুখটা দেখতে পারব কিনা।’
আরশাদ ও হুমায়ুনের গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারিদুর্ঘটনায় নিহত দৌলতদিয়া ইউনিয়নের মিরাজ মণ্ডলের বাবা কৃষক ছহের মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে মিরাজ তৃতীয়। সাত মাস সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ওকে সৌদি আরবে পাঠাই। দুই সপ্তাহ মতো ওর সঙ্গে কথা হয়নি। পরে কাল (শুক্রবার) রাত ১২টার দিকে সৌদি আরব থেকে আমাদের পাশের গ্রামের আলমাস ফোন করে জানায়, মিরাজ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’
সৌদি আরব থেকে ইমোর মাধ্যমে মিরাজ মণ্ডলের চাচাতো ভাই শফিউদ্দিন সূর্যের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) দিবাগত রাতে মিরাজসহ মোট ছয়জন একটি গাড়িতে করে দাম্মাম থেকে কাজের জন্য আলজুব আরার এলাকায় যাচ্ছিল। পথে তাদের গাড়িটি হাবরায়ে আল বাথান এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী আরেকটি গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মিরাজসহ ছয়জন মারা যান।’
প্রবাসী ছয় বাংলাদেশি তরুণের মৃত্যুতে নিহতদের পরিবারই শুধু নয়, গ্রামগুলোতেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়েছে পরিবারগুলোর সঙ্গে। গোয়ালন্দের উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মো. হাসান হাবীব বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। নিহতদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছি। মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

আরও পড়ুন-

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ ভাইসহ ৬ বাংলাদেশি নিহত

ধর্ষণের পর নির্যাতিতা ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া, শ্রমিক লীগ নেতাসহ গ্রেফতার ৪

/এসএমএ/টিআর/