২০১১ সালের ১ নভেম্বর জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় লোকমান হোসেনকে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যার ঘটনায় ১৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের হলে পুলিশ তদন্তের পর এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বাদীপক্ষ পুলিশের এই অভিযোগপত্র মেনে না নেওয়ায় উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় মামলাটি। তবে পুলিশি তদন্তে এ হত্যা মামলার এজাহারবহির্ভূত আসামি কিলার শরিফ বলে খ্যাত শরিফুল ইসলাম শরিফ ও তার অপর তিন সহযোগীকে অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পলাশতলী ইউনিয়নের মেঝেরকান্দি গ্রামের শাহ নেওয়াজ ভূঁইয়ার ছেলে লোকমান হোসেন কলেজ জীবন থেকেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। পরে নরসিংদী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন লোকমান হোসেন। জনপ্রিয়তার কারণে ২০১১ সালের পৌর নির্বাচনেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। সেসময় তিনি নরসিংদী পৌরসভার রাস্তাঘাট প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ৮ মাসের মাথায় ২০১১ সালের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার ঘটনায় তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন লোকমান হোসেনের ছোট ভাই বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান।
দীর্ঘ ৮ মাস ধরে আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত শেষে এজাহারভুক্ত ১৪ আসামির মধ্যে প্রধান আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে এজাহারবহির্ভূত ১২ জনকে অভিযুক্ত করে নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মামুনুর রশীদ মণ্ডল। এ সময় অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন জানালে আদালত নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন। পরে মামলার বাদী উচ্চ আদালতে যান। গত ৮ অক্টোবর উচ্চ আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে নির্দেশ দেন। এতে আসামিপক্ষ চেম্বার জজ আদালতে লিভ টু আপিল করলে আদালত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন।
এভাবে ছয় বছর ধরে থমকে আছে মামলার বিচার কাজ। লোকমান হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে বর্তমানে প্রধান আসামি শরীফ জেলহাজতে, মোবারক হোসেন নামে একজন পলাতক ও বাকিরা জামিনে। ছয় বছরেও এই হত্যা মামলার বিচার কাজ শেষ না হওয়ায় হতাশ লোকমানের পরিবার।
লোকমান হত্যা মামলার বাদী ও বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘এ হত্যা মামলার আসামিরা রিমান্ড শুনানির আগেই বের হয়ে গেছে। মামলাকে নস্যাৎ করতে শুরু থেকেই চেষ্টা চলছে। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তড়িঘড়ি করে। এতে মামলার মূল আসামিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি দিলে তা খারিজ করা হয়। পরে জজ কোর্টে রিভিশন করলেও খারিজ করা হয়। বাধ্য হয়ে আমি হাইকোর্টে গেছি। আমরা শতভাগ আশাবাদী লোকমান হত্যার বিচার নরসিংদীর মাটিতে হবে।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী আসাদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য উচ্চ আদালত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আসামি পক্ষ লিভ টু আপিল করায় আগামী ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। আশাকরি পুনরায় তদন্ত হলে প্রকৃত আসামিরা অবশ্যই চার্জশিটভুক্ত হবে এবং তাদের বিচার হবে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. ফজলুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা না পাওয়ায় লোকমান হত্যা মামলার বিচার কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।’