মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যে নারীর পরিবর্তে পুরুষ, আন্দোলনে যাচ্ছে মহিলা পরিষদ

নারী প্রতিকৃতি বদল করে পুরুষে রূপ দেওয়া হয়েছেকিশোরগঞ্জের তাড়াইলে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি সরিয়ে সেখানে পুরুষের প্রতিকৃতি স্থাপন করায় আন্দোলনে যাচ্ছে মহিলা পরিষদ। এছাড়া তিন দিনের মধ্যে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তারা। সংগঠনটির নেত্রীরা বলছেন, এমন এটি জঘন্য কাজ তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না। অবলিম্বে নারীর অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ভাস্কর্যটিতে নারীকে আবারও পুনঃস্থাপন করা না হলে কঠোর আন্দোলনে যাবেন বলে জানিয়েছেন তারা। এছাড়াও এই ঘটনায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা ও বিশিষ্টজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।





কিশোরগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মায়া ভৌমিক বলেন, ‘তাড়াইলে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য থেকে নারীর প্রতিকৃতি ভেঙে পুরুষে রুপান্তরিত করার ঘটনায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। এখানে নারীকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বঞ্চিত করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে নারীকে। এটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তিন দিনের মধ্যে একটি মানববন্ধন করার। এতেও যদি সেই নারীকে পুনরায় প্রতিস্থাপন না করা হয় তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাবো। মুক্তিযুদ্ধের অবদান থেকে নারীকে বাদ দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ভাস্কর্যের কাজ চলছে। এ ভাস্কর্যে তিন জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি ছিল। তার মধ্যে ছিল একজন নারী মুক্তিযোদ্ধাও। পুরো ভাস্কর্যটির কাজও শেষের দিকে ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটি মহলের চাপ ও নির্দেশে ওই নারী মুক্তিযোদ্ধার আকৃতি ভেঙে সেখানে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি স্থাপনের ঘটনা ঘটে।
কিশোরগঞ্জ উইমেন চেম্বারের সভাপতি ফাতেমা জোহরা আক্তার বলেন, ‘এই ঘটনায় শুধু মুক্তিযুদ্ধের অবদান থেকে নয়, নারীকে তার সাংবিধানিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। কোনও ধর্মান্ধগোষ্ঠীর চাপে এমন সিদ্ধান্ত আমরা সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ মেনে নিতে পারি না। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে পুনরায় নারীকে সেখানে অচিরেই দেখা না গেলে আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করবো।’
তাড়াইল উপজেলা মুক্তিযুদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মো. আবদুল হাই বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান আছে। ভাস্কর্যটি তৈরি করার সময় আমাদের সঙ্গে কোনও সমন্বয় করা হয়নি। নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সেখান থেকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি। স্থানীয় কোনও সমস্যা থাকলে অন্যদিকে ঘুড়িয়ে স্থাপন করলেই এটা নিয়ে আজ কোনও সমস্য দেখা দিতো না।’
এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, নারী-পুরুষের মিলিত প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই ভাস্কর্য থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধাকে বাদ দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী।
তাড়াইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন লাকী বলেন, ‘ভাস্কর্যটিতে নারীকে রেখেই কাজ শেষ করার কথা ছিল। সেখান থেকে নারীকে বাদ দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। যেহেতু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনও কাজ বুঝিয়ে দেননি তাই কাজটি চলমান। ভাস্কর্য থেকে যদি নারীকে বাদ দেওয়া হয় তবে তা আমরা মেনে নেবো না।’
কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ শরীফ আহমেদ সাদী বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পর নারী মুক্তিযোদ্ধাকে ভাস্কর্য থেকে বাদ দিয়ে নারীদের অবদানকে ছোট করা হয়েছে। কিছু ধর্মান্ধ লেবাসধারী ব্যক্তিদেরকে আস্কারা দিয়ে নারী-পুরুষের সমতা ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থী এসব কার্যক্রমে যারা সম্পৃক্ত হচ্ছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ভাস্কর্যকে আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।’
তাড়াইল উপজেলা পরিষদের সামনে একটি খোলা জায়গায় ২০১৬ সালে ভাস্কর্যটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। মেসার্স পারুল এন্টারপ্রাইজ করিমগঞ্জ ও মেসার্স স্বর্ণা এন্টারপ্রাইজ তাড়াইলে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ দুটি পায়। দুটি ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯ লাখ টাকা। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ ভাস্কর্যটির কাজ বাস্তবায়ন করছে। ভাস্কর সুষেন আচার্য ও শ্যামল আচার্য ভাস্কর্যটির কাজ করছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিবির বিচিত্র বড়ুয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, জেলা পরিষদ ডিজাইন পরিবর্তন করে ভাস্কর্যের কাজ করতে শিল্পীকে কোনও চিঠি বা নির্দেশ দেয়নি।
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, ভাস্কর্যটির কাজ গত জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় আরও ছয় মাস সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।