প্রথমবারের মতো ফসল রক্ষা বাঁধ হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরে, বিরোধিতা কৃষকদের

ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরেআগাম বন্যায় ফসলহানি ঠেকাতে কিশোরগঞ্জের হাওরে প্রথমবারের মতো বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামসহ আটটি উপজেলার ৯টি হাওরে নির্মাণ করা হবে ২০০ কিলোমিটার কাঁচা বাঁধ। বাঁধগুলো চার ফুট উঁচু এবং ২৫ থেকে ৩০ ফুট প্রস্থ হবে। ৬০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের অর্থায়ন করছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। আগাম বন্যা প্রতিরোধে খাল খনন এবং ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি স্লুইস গেটও নির্মাণ করা হবে। তবে এসব কাঁচা বাঁধ দিয়ে বন্যা ঠেকানো যাবে না বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তারা প্রতিরক্ষা দেয়াল বা সিসি ব্লক দিয়ে আট থেকে ১০ ফুট উচু বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন।

মিঠাইন উপজেলার দক্ষিণের হাওরে যে ৩৩ কিলোমিটার বাঁধ তৈরি হচ্ছে, তার সবটাই কৃষকদের জমির ওপর। অথচ জমি অধিগ্রহণের কোনও টাকা এখনও পরিশোধ করা হয়নি। কাজ শেষ হওয়ার আগেই জমির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন কৃষকরা। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিগ্রহণের জন্য এরইমধ্যে জেলা প্রশাসকের সংশ্লিষ্ট শাখায় ৪৫ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। জরিপের মাধ্যমে সময়মতো ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা পরিশোধ করা হবে।ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরে

মিঠামইন উপজেলার চারী গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া বলেন, ‘আমরার সবার জমির উফরে দিয়া এই বেইরী বাঁধ হইতাসে। যে জমির উফরে দিয়া অইতাসি এইহানো গরিবের জমিই বেশি অংশ। গত বছর আমরার যে মাইর গেছে, এইবারও আমরা জমি ঠিক মতো লাগাইতে পারছি না। অনেক জমি গেছেগা বান্দের ভিতরে। অনেকের পুরা জমিই বান্দের মধ্যে পইরা গেছে। জমি অধিগ্রহণের টেহা অহন পর্যন্ত আমরা পাইসি না। কবে পাইয়াম এইডাও কেউ কয় না।’

অন্যদিকে, কাঁচা বাঁধ তৈরি করে হাওরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা জানিয়েছেন, সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধ তৈরি না করলে বাঁধ ভেঙে আবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিরক্ষা দেয়াল বা সিসি ব্লক দিয়ে আট  থেকে ১০ ফুট উচু বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরে

মিঠামইন উপজেলার চারী গ্রামের কৃষক মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘গত বছর আগাম বন্যায় আমরার সব জমি ভাসায়া লইয়া গেছে। এইবার হাওরে হাজার হাজার একর জমি পতিত পইরা আছে। অহন একটা বান্দের (বাঁধ) কাম ধরছে। কেউ কয় তিন ফুট উঁচা অইবো, কেউ কয় চাইর ফুট উঁচা অইবো। এমুন কম উঁচা বান্দে কোনও কাম অইতো না। যদি আসলেই বান টিকাইতে চায় তাইলে ওয়াল দিয়া বান দিতে অইবো। নাইলে পানির স্রোতে সব আবার ভাইঙ্গা যাইবো।’ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরে

ইটনা উপজেলার শিমুলবাগ গ্রামের কৃষক মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘গত বছর চৈত্র মাসের ১৩ তারিখ আতকা (হঠাৎ) পানি ঢুইক্কা আমরার ফসল সব নষ্ট কইরা দিসে। অনেক কষ্টের ফসল চোখের সামনে শেষ হইয়া গেছে। আমরার এলাকাত আগে কোনোদিনই সরকার বান্দ (বাঁধ) দিসে না। এইবার পয়লা বান্দ দিতাসে। কিন্তু যে উছা কইরা মাইট্টা (মাটির)বান্দ দিতাসে এই বান্দ থাকতো না। অন্তত আট ফুট উঁচা না করলে এই মাইট্টা বান্দ বানির নিচে থাকবো,ভাইঙ্গা যাইবো। সিসি ব্লক ছাড়া এই বান্দ টিকতো না। অযথা খালি পয়সা খরচ কইরা লোক দেহানো বান্দ কইরা কী লাভ অইবো।’

জাইকার প্রকল্প ছাড়াও ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর,অষ্টগ্রামের খয়েরপুর ও আবদুল্লাপুর হাওর এবং ইটনার বেড়া মোহনায় গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরুর কথা ছিল। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা সময়মতো শুরু হয়নি। পানি দেরিতে নামার কারণ দেখিয়ে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কাজ শুরু করা হয়েছে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরে

পানি উন্নয়ন বোর্ড, কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকায় কোনও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ছিল না। বিগত বন্যার পর সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে আমরা এ এলাকায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কাজ হাতে দিয়েছি, যা চলমান আছে। এসব বাঁধের উচ্চতা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নির্ণয় করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যথাযথ মজবুত করেই এ বাঁধ বানাচ্ছি। সব জায়গায় সিসি ব্লক দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যে যে স্থানে ঢেউয়ের আঘাত বেশি সেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সিসি ব্লকের প্রয়োজন হবে। ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। জমি অধিগ্রহণের জন্য আমরা ৪৫ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিয়েছি। সময়মতো ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের জমির দাম পেয়ে যাবেন।’