উপজেলায় যে নারী ইউএনওরা কর্মরত রয়েছেন তারা সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি সব মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এ পর্যন্ত কোনও ইউএনওর বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে এই নারী কর্মকর্তারা সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছেন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ইউএনও ড. উর্মি বিনতে সালাম প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য এবার সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইউএনও নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাবের হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি জানানো হয়। দেশসেরা ইউএনও নির্বাচিত হওয়ায় ৬ মার্চ রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ড. উর্মি বিনতে সালামকে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক দেওয়া হয়। এর আগে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাসের আয়োজন করে সুনাম কুড়িয়েছেন। তাছাড়া শিক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আগেও পেয়েছেন জাতীয় শিক্ষা পদক।
কুলিয়ারচরের ইউএনও সম্পর্কে সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল মিল্লাত বলেন, ‘এ কর্মকর্তাকে (ড. উর্মি) নিয়ে আমরা গর্ব করি। তার মতো এমন নম্র ও ভদ্র মানুষ খুব কম দেখেছি। অনেক সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। কিন্তু তিনি এতটাই ভালো যে তার সঙ্গে রাগ বা বিরোধ করার কোনও সুযোগ নেই। সততা ও কাজের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।’
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা আহমেদ নিয়োগ পান ২০১৬ সালের ২ মার্চ। এই মার্চে ইউএনও পদে দু’বছর পূর্ণ করলেন তিনি। এরই মধ্যে ভৈরববাসীকে কাছে টেনে নিয়েছেন তিনি। সেখানকার সব মহলে দিলরুবার নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক মিয়া ইউএনও দিলরুবার প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই কর্মকর্তার (দিলরুবা আহমেদ) মনমানসিকতা অনেক ভালো। সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। রাজনৈতিক বিভিন্ন চাপ থাকলেও তার দক্ষতার কারণে এসব বোঝা যায় না। আন্তরিকতা আর মমতার মিশেলে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘সারাদেশের সবগুলো উপজেলায় তার মতোন ইউএনও বসানো হলে বাংলাদেশ বদলে যাবে।’
এক বছরও পার হয়নি পাকুন্দিয়ায় ইউএনও হিসেবে যোগ দিয়েছেন অন্নপূর্ণা দেবনাথ। তিনি পাকুন্দিয়ায় একজন জনপ্রিয় কর্মকর্তা। কেউ কেউ তাকে ‘দেবী দুর্গা’র সঙ্গে তুলনা করেন। তার নাকি ১০টি হাত। একসঙ্গে ১০ হাতে কাজ করেন তিনি।
উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরকার শামীম আহমেদ ইউএনও সম্পর্কে বলেন, ‘সবারই কমবেশি দোষত্রুটি থাকে। কিন্তু এমন শতভাগ সৎ কর্মকর্তা আমি আর দেখিনি। সৎ হলেও অনেকে সততার অহঙ্কার করেন। তার মধ্যে এসব নেই, একেবারে মাটির মানুষ। কাজেকর্মেও শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখেন। সব সময় ভালো কাজ করার উৎসাহ দেন। ’
অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘এ উপজেলা রাজনীতি নিয়ে মাঝে মাঝে কিছুটা উত্তপ্ত থাকে। এগুলো সামলানো অনেক সময় বেগ পেতে হয়। কিন্তু আমি সব পক্ষগুলোকে একসঙ্গে করে কাজ করি। সবাই আমাকে সহযোগিতাও করে। আর নারীরা সমন্বয় করে কাজ করতে পছন্দ করে, আমিও তাই করি। স্বামী-সংসারও একই গতিতে চলছে।’
এত বড় পদে কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা নারী অগ্রযাত্রা ও জাগরণেরই ফসল। বাংলাদেশের নারীরা আরও অনেক দূর যাবে।’
তাড়াইলের ইউএনও সুলতানা আক্তার আড়াই বছর কাজ করে সপ্তাহ খানেক আগে বদলি হয়েছেন। তার জায়গায় যিনি এসেছেন, তিনিও নারী। নাম লুৎফুন নাহার। আগের ইউএনও সুলতানা আক্তার বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে তাড়াইলে নিজের একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। তার বিদায়ের সময়েও মন খারাপ হয়েছে তাড়াইলবাসীর। তিনি যত দিন তাড়াইলে ছিলেন, কাজ ছাড়া কিছুই বোঝেননি। এসব করতে গিয়ে তিনি তার পরিবারকেও ঠিকমতো সময় দিতে পারতেন না তিনি। এতেও তার মনে কোনও আক্ষেপ ছিল না।
নতুন ইউএনও লুৎফুন নাহার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান মহাজন বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিনেই তিনি তাড়াইলবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। তার কথাবর্তা, আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি খুব আন্তরিক হবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত তাড়াইলে চারজন নারী ইউএনও এসেছেন। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নারী প্রশাসকের সঙ্গে কাজ করে আমরা স্বস্তিতেই ছিলাম।’
হাওর অধ্যুষিত মিঠামইনের প্রথম নারী ইউএনও তাসলিমা আহমেদ পলি। ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর সেখানে যান তিনি। এরপর থেকে ভৌগলিক কারণসহ নানা কারণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন পলি।
এ নারী ইউএনও সম্পর্কে উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন শাহাব বলেন, ‘মিঠামইনে আমি এ পর্যন্ত যত ইউএনও দেখেছি, তার মধ্যে পলি হচ্ছেন সেরা। আচার-ব্যবহার ও কাজ দিয়ে তিনি সবার মন জয় করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড় পদে নারীরা থাকলেই ভালো, কারণ নারীরা অনিয়ম-দুর্নীতি কম করেন। তার সততায় আমি মুগ্ধ।
কটিয়াদীর ইউএনও হিসেবে চার মাস ধরে কর্মরত আছেন ইসরাত জাহান কেয়া। তার আগের ইউএনও ছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি এলাকায় খুব সুনাম কুড়িয়ে বদলি হয়েছেন। তবে আগের ইউএনওর অভাব বুঝতে পারছে না কটিয়াদীবাসী। পূর্বসূরীর পথ অনুসরণ করে সবাইকে আস্থায় নিয়ে সততার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।
তার সম্পর্কে কটিয়াদীর বনগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মিলন বলেন, ‘তিনি কাজের লোক। চেয়ারম্যানদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করেন তিনি। সমন্বয় ও পরামর্শ করে কাজ করতে তিনি পছন্দ করেন। ’
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে করিমগঞ্জে শারমিন সুলতানা, তাড়াইলে লুৎফুন নাহার, পাকুন্দিয়ায় অন্নপূর্ণা দেবনাথ, কটিয়াদীতে ইসরাত জাহান কেয়া, মিঠামইনে তাসলিমা আহমেদ পলি, কুলিয়ারচরে ড. উর্মি বিনতে সালাম ও ভৈরবে দিলরুবা আহমেদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো.আক্তার জামিল বলেন, ‘জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে সাতটি উপজেলায় নারী ইউএনওরা তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের কাজ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি। সবাই ভালো করছেন।’