নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের আজ চার বছর পূর্ণ হলো। এই সাত জনের মধ্যে পাঁচ জনের পরিবারের সদস্যদের দাবি, অবলম্বন করার মতো সদস্য হারিয়ে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
মনিরুজ্জামান স্বপনের ছোট ভাই মিজানুর রহমান রিপন বলেন, ‘সরকার বলেছিল নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে। কোথায় সরকার। কেউ তো আমাদের খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। বরং ভাইকে হত্যার পর ভাইয়ের এবং আমার নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য সব জোর করে দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। ছোট-খাটো কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। বড় ভাইয়ের দুই মেয়ে পড়াশোনা করে। তাদের সংসার চালানো, পড়াশোনার খরচ, বাবা-মায়ের সংসার ও নিজের সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি।’
সাত খুনের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়ির চালক জাহাঙ্গীর, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়ি চালক ইব্রাহিম খুন হন। এদের মধ্যে নজরুল ইসলাম ও চন্দন সরকার ছাড়া বাকি পাঁচ পরিবারের অবস্থা খুবই নাজুক। অর্থকষ্টে দিন যাপন করছেন তারা।
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সাবেক কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে আশ্বাস দিয়েছিলেন, এই হত্যার বিচার উনি করবেন। নিম্ন আদালতে এবং উচ্চ আদালতে যে রায় আমরা পেয়েছি— তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে এখন আমরা হতাশায় ভুগছি, এই বিচারের রায়টা কবে কার্যকর হবে। রায় যতদিন পর্যন্ত কার্যকর না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের মনের ভেতরে স্বস্তি নেই। আমি স্বামী হারিয়েছি। সন্তানরা বাবা হারিয়েছে। আমাদের তো সব কিছুই শেষ। এখন আমাদের একটি চাওয়া রায় কার্যকর দেখে যাওয়া। যাতে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড দেশে আর কেউ সংগঠিত করতে সাহস না পায়।’
বিউটি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সন্তানদের লেখাপড়া করানো বা সংসার চালানোর জন্য কোনও সহযোগিতা করা তো দূরের কথা, গত চার বছরে খোজঁ পর্যন্ত নেয়নি। ’
নিহত স্বপনের গাড়ি চালক জাহাঙ্গীরে স্ত্রী নুপুর ঘটনার সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে জন্ম নেওয়া কন্যা সন্তান রোজাকে নিয়ে এখন কষ্টে কাটছে নুপুরের জীবন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মাস্টার রোলে মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন তিনি। সাড়ে তিন বছরের শিশু রোজা এখনও জানে না তার বাবা আর কোনও দিন আসবে না। কোনও দিন পাবে না বাবার আদর। সরকারকে মেয়ের ভরণ-পোষণ ও পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নুপুর।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ৩৮টি কর্মদিবসে ১০৬ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে বহুল প্রতীক্ষিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন ও সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আদালত। পরবর্তীতে আসামিপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে। ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট উচ্চ আদালতের রায়ে নূর হোসেন, র্যাবের তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাসহ ১৫ জনের মৃত্যদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘সাত খুনের মামলায় গত বছরের ২২ আগস্ট উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় এখনও পাওয়া যায়নি। যেহেতু, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা; এখানে ১৫ জন আসামির ফাঁসির আদেশ হয়েছে। মামলার রায়টি প্রস্তুত করতে সময় লাগছে। যেহেতু আসামিরা এখনও রায় পায়নি, তাই তারা আপিলও করতে পারেনি।’
নিহতদের স্মরণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি জানান, তার স্বামী নজরুল ইসলাসহ নিহত সাত জনের রুহের মাগফেরাত কামনায় শুক্রবার (২৭ এপ্রিল) দিনব্যাপী কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও এতিমদের মাঝে রান্না করা খাবারও বিতরণ করা হবে।