গাজীপুর মহানগর জুড়ে সোমবারও ছিল নির্বাচন স্থগিতের আলোচনা

গাজীপুর 

গাজীপুর মহানগরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। নির্বাচন স্থগিতের ফলে কার লাভ, কার ক্ষতি এবং হঠাৎ করে কেন রিট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মহানগরের সব জায়গায় আলোচনা হচ্ছে। সোমবার সারাদিন বিভিন্ন জায়গা ঘুরে সবাইকে এ আলোচনা করতে দেখা গেছে। হঠাৎ করে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিব্রত ও ভোটাররা একটি নিশ্চিত উৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। 

মহানগরের ধীরাশ্রম বাজারের প্রবীণ মনিহারী ব্যবসায়ী তাহের আলী (৭০) বলেন, ‘সরকারি দলের পরাজয়ের একটা সম্ভাবনা ছিল। স্থগিত হওয়ায় মানুষ এখন এ বিষয়টি আরও জোড়ালোভাবে বিশ্বাস করছে। ’

পরাজয়ের সম্ভাবনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোটাদের সঙ্গে সরকার দলীয় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ ভালো ছিল না। ভোটের সময় আসলেই তারা গণমানুষের কাছে আসেন। গণমানুষের সঙ্গে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের আরও আগে থেকে যোগাযোগ রক্ষা করা উচিত ছিল।’

ধীরাশ্রম পশ্চিম পাড়া এলাকার তরিকুল ইসলাম কসমো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, ‘নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে রিট করার ঘটনাটিকে গাজীপুর মহানগরের মানুষ ভালো  চোখে দেখেনি। এ ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আমাদের এলাকার কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরাও মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছেন। তফছিল অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে গেলেই ভালো হতো।’

নগরীর ২৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রিকশাচালক মোশারফ হোসেন বলেন, রিকশার যাত্রীরা, চা স্টলের ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সব জায়গায় নির্বাচন স্থগিত নিয়ে আলোচনা চলছে। আমারও ইচ্ছে ছিল ১৫ তারিখ ভোট দেবো। নগরী জুড়ে মাইকে প্রচার, পোস্টারের ছড়াছড়ি, প্রার্থীদের গণসংযোগ একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরি করেছিল। নির্বাচনটা হয়ে গেলেই ভালো হতো। আমরা সাধারণ মানুষরা নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি ভালোভাবে দেখছি না।’

গাজীপুর মহানগরের মুন্সীপাড়া এলাকার ছাপাখানার কর্মচারী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘প্রার্থীদের ভোটার স্লিপ তৈরি, লিফলেট, বেইস প্রভৃতির অর্ডার ছিল। অনেক কিছু ছাপা হয়ে গেছে। আবার অনেক কিছু এখনও বাকি রয়েছে। নির্বাচন স্থগিতের পর সে সব অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে। প্রার্থীরা যেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি ব্যবসায়ী হিসেবে এ সময়টাতে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

গজারিয়া এলাকার ২২নং ওয়ার্ডের করাত প্রতীকের কাউন্সিলর প্রার্থী জাকির হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছিল। এখন শুধু প্রচার চলছিল। এ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিতের ঘটনা আমাদের আহত করেছে।’

নগরের সামন্তপুর এলাকার ২৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ঘুড়ি প্রতীকের মনির হোসেন বলেন, ‘যে শ্রম আর সময় নির্বাচনের জন্য ব্যয় করেছি তা আবার প্রথম থেকে ব্যয় করতে হবে। একেবারে ভোটের দিনের কাছাকাছি আসার পর নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় আমরা বিস্মিত হয়েছি।’ 

একই এলাকার সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী জিপ গাড়ি প্রতীকের ছাবিহা বেগম বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার উচিত ছিল সব ধরনের জটিলতা নিরসন করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া। প্রচারের মাঝখানে নির্বাচন স্থগিতের এরকম খবর বিশেষ করে আমার মতো নারী প্রার্থীদের জন্য কষ্টদায়ক এবং ক্ষতিকর।’

গাজীপুর জেলা আওয়াম লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ সোমবার শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বলেন, ‘স্থগিতের আদেশের বিষয়টি আদালতের। কিন্তু খুনী পরিবারের একজন ব্যক্তিকে নিয়ে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট ঘোলা পানিতে মাছ ধরার চেষ্টায় রয়েছে। গাজীপুর মহানগরের মানুষ আহসান উল্লাহ মাস্টারের খুনী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চিনে রেখেছে। গাজীপুর মহানগরের নির্বাচনকে তারা ৭ মে এর মতো আরেকটি রক্তাক্ত ঘটনার এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চেয়েছিল। ’

গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ মণ্ডল বলেন, ‘আদালতের আদেশের সুত্র ধরে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট গণমানুষকে ভুল বোঝানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এটি একান্তই আদালতের ব্যাপার।’

 গাজীপুর মহানগর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে আদালতের বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে বিএনপি মোননীত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘এমন ঘটনা নোংরামি। আমরা উচ্চ আদালতে বিষয়টির সমাধান করতে চাই।’

গাজীপুর জেলা বিএনপি’র শিল্প বিষয়ক সম্পাদক এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘সারা বাংলাদেশের মতো গাজীপুরের মানুষও আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এটা আঁচ করতে পেরে এবং নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য আওয়ামী লীগ আদালতকে ব্যবহার করছে। আদালতের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আশা করি আদালত যথা সময়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিবেন।’

গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘ভোটের মাঠে সরকার দলীয় প্রার্থীর নিশ্চিত পরাজয় জেনে তারা এখন ভোটের মুখোমুখি হতে শংকিত হয়ে পড়েছে। নির্বাচন স্থগিতে বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্র রয়েছে।’