রোজায় কদর বাড়ে মানিকগঞ্জের হাতে ভাজা মুড়ির

মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত ধলাই গ্রামের লোকজনমানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ধলাই গ্রামের গৃহবধূ রোকেয়া বেগম। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরেই তিনি মুড়ি ভাজার কাজ করছেন। কীটনাশকমুক্ত মুড়ি ভাজায় তার মুড়ির কদর বেশি। বিশেষ করে রোজার সময় এমন মুড়ির কদর বেড়ে যায়। শুধু রোকেয়াই নয়, তার মতো মানিকগঞ্জের অনেকেই বছরের এই সময়টা ব্যস্ত সময় পার করেন মুড়ি ভেজে।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নবগ্রাম, ধলাই, উফাজানি ও সরুপাই গ্রামের গৃহবধূরা মুড়ি ভাজেন।  সরেজমিন ধলাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রোকেয়া বেগমের বাড়িতে হাতে ভাজা ভুষিভাঙা মুড়ির ময়ময় গন্ধ। পরিবারের সবাই ব্যস্ত মুড়ি তৈরির কাজে। রোজার প্রথম থেকে প্রতিদিন তারা ২-৩  মণ মুড়ি মাটির চুলায় ভেজে বিক্রি করছেন।

পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি কিনে জেলা শহরের বড় বড় দোকানে নিয়ে বিক্রি করে। এছাড়া এই অঞ্চলের মুড়ি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এই গ্রামের কমপক্ষে আরও ১০-১৫টি বাড়িতে চলছে মুড়ি ভাজার ধুম।

রোকেয়া বলেন, ‘হাতে ভাজা মুড়ির কদর সবচাইতে বেশি থাকে রমজান মাসে। আমরা যে মুড়ি তৈরি করি তাতে কোনও ধরনের ভেজাল নেই। নেই কোনও রাসায়নিক ও ক্ষতিকার পদার্থ। যার কারণে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। এই মাসে প্রতিদিনই পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মুড়ি কিনে তা শহরে বেশি দামে বিক্রি করে। পাইকাররা আমাদের থেকে প্রতিকেজি মুড়ি ১০০-১০৫ টাকা দরে কেনে। আর বিক্রি করে ১৪০-১৫০ টাকা কেজি দরে।’

মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত রোকেয়া বেগমএকই এলাকার মুড়ি ভাজার কাজ করেন তাহের আলী। তিনি বলেন,  ‘৪৫ বছর ধরে মুড়ি ভাজার কাজ করছি। কিন্ত এখন আর আগের মতো সুখ নেই, স্বচ্ছলতা নেই সংসারে। পুঁজি না থাকায় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া দামে ধান কিনতে হয়। শুধু তাই নয়, কষ্ট করে মুড়ি ভেজে অল্প দামে তাদের দিতে হয়। সরকার যদি আমাদের অল্প সুদে লোন দিতো তাহলে রবিশাল থেকে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি ভাজতে পাড়তাম।’ 

একই গ্রামের সকিনা বেগম বলেন, ‘সারা বছরের চাইতে রমজানে আমাদের তৈরি হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। মুড়ি ভেজে সারা যায় না। মাথার ওপর পাইকাররা দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বরিশাল থেকে চড়া দামে ধান কিনে আনার কারণে লাভ  কম হয়।’

মুড়ির আরেক কারিগর শাজানান মিয়া বলেন, ‘বাজারে মেশিনে সার দিয়ে ভেজাল মুড়ি তৈরি করায় আমাদের মুড়ি উৎপাদন অনেক কমে গেছে। কারণ ওইসব মুড়ি প্রতিকেজি ৫০-৬৫০ টাকায় পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছ থেকে এক কেজি মুড়ি কিনতে হলে কমপক্ষে  ১১০ টাকা লাগে।’

Manikganj-Muri-Pic-03স্থানীয় ইউপি সদস্য রশিদ  জানান, এক সময় গ্রামগুলো মুড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রত্যেকটি বাড়িতে মুড়ি ভাজা হতো। বর্তমানে বাজারে আধুনিক মেশিন দিয়ে রাসয়নিক পদার্থ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করায় এ অঞ্চলের মানুষ হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে গেছে।

নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিব হোসেন ফরহাদ জানালেন, আগে চার গ্রামে ১০০ পরিবার মুড়ি ভাজার কাজ করতো। এখন কমে হয়েছে ২০-২৫ পরিবার। এদের সরকারিভাবে সহযোগিতা দেওয়া হলে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আবারও ফিরে আসতো এই পেশার লোকবল।