আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফতুল্লা বিসিকে ভবন নির্মাণ

ফতুল্লা বিসিকে ভবন নির্মাণনারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শাসনগাঁওয়ের বিসিক শিল্পনগরীতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছে বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। অনিয়মের মাধ্যমে ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর শত কোটি টাকা মূল্যের ৩০টি প্লট মাত্র পৌনে ২ কোটি টাকায় বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অনিয়মের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ পেলেও অধ্যাবধি জমির রেজিস্ট্রেশনও সম্পন্ন  করতে পারেনি তারা। এর আগে ২৩ জানুয়ারি ওই ৩০টি প্লটে কোনও ধরনের কার্যক্রম না চালাতে ১ বছরের জন্য স্থগিতাদেশ জারি করেছিলেন আদালত। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশনা আমান্য করে তারা জমিতে ভবন নির্মাণ কাজ চালিয়ে আসছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিরোধপূর্ণ ওই সব জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞার সাইনবোর্ড তুলে ফেলা দেওয়া  হয়েছে। কিছু প্লটে আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে পাইলিং এর কার্যক্রম চলছে। অনেকগুলো প্লটে নির্মাণ শ্রমিকদের রড বাঁধাইয়ের কাজ করতেও দেখা গেছে।

ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহা ব্যবস্থাপক (এজিএম) বদিউজ্জামান খান জানান, ওই প্লটগুলোতে কোনও ধরনের কার্যক্রম না চালানোর জন্য আদালত ১ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কিন্তু, বরাদ্দ পাওয়া কিছু কিছু মালিক সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসার পরে আমরা তাদেরকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনও ধরনের কাজ না করতে নিষেধ করেছি। কিন্তু, তারা আমাদের কথা শুনছেনা। আমরা এ বিষয়ে বিসিকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশন ও বিসিক শিল্পনগরীর গার্মেন্ট মালিক সমিতির সভাপতিকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেছি।

কমমূল্যে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহা ব্যবস্থাপক (এজিএম) বদিউজ্জামান খান বলেন, ‘বিসিকের কোনও এলাকার জমির দর কত হবে— সেটা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এ বিষয়ে আমাদের কিছুই করার থাকে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি শিল্পটির অস্তিত্ব রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি শিল্প ইউনিটকে কেন্দ্রীভূত করে পুনর্বাসন ও নতুন কারখানা স্থাপনে ১৯৮৫ সালে মনোটাইপ শিল্পনগর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় সরকার। ১৯৮৮-৮৯ সালে বিসিক শিল্পনগরীতে ৩ কাঠা এবং ৫ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিসিক কর্তৃপক্ষ। পরে ১৯৯০ সালে বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে পঞ্চবটীর শাসনগাঁও এলাকায় ৫৮ দশমিক ৫২ একর জায়গার ওপর বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। হোসিয়ারি শিল্পনগরীর ৭১৪টি ইউনিটের মধ্যে পাঁচ কাঠার ১৮৬টি বড় প্লট এবং তিন কাঠার ৫২৮টি ছোট প্লট।

ফতুল্লা বিসিকে ভবন নির্মাণ১৯৮৮-৮৯ সালে বিসিক শিল্পনগরীর বিজ্ঞপ্তি দেখে ৩০টি প্লটের জন্য ২৩ জন ব্যবসায়ী বিসিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অর্থাৎ জনতা ব্যাংক এসটিডি-৭ ছৈয়দ আলী চেম্বার শাখায় অর্থ জমা দিয়ে বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতির কাছ থেকে রশিদ নেয়। তবে দীর্ঘদিনেও তাদেরকে ওই প্লটগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং বিরোধপূর্ণ ওই প্লটগুলোকে ২০১৬ সালের জুন মাসে বর্গফুট হিসেবে ১৪ জন শিল্প মালিকের কাছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয় বিসিক কর্তৃপক্ষ। নিয়মানুযায়ী ক্ষুদ্র হোসিয়ারি ব্যবসায়ীরা প্লট পাওয়ার কথা থাকলেও প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের। বরাদ্দ পাওয়া ১৪ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন হোসিয়ারির মালিক। বাকি ১১জনই হলেন গার্মেন্ট মালিক। ওই ১০টি গার্মেন্ট হচ্ছে ইনোভেটভ টেক্স লিমিটেড, পেনটেক্স ড্রেস লিমিটেড, ফোর ডিজাইন লিমিটেড, মেসার্স জামাল নীট অ্যান্ড গার্মেন্টস, মেসার্স শিমু নীট ওয়্যার, মেসার্স ইশা নীট ফ্যাশন, স্কারলেট নীট ওয়্যার, মেসার্স ইয়াংফা ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স এইচ কে নীট ফ্যাশন, সৃষ্টি ফ্যাশন লিমিটেড ও মিলান বাংলা ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড।

দীর্ঘদিনেও প্লট বুঝিয়ে না দেওয়ায় এবং বর্তমান বাজারদরের কম মূল্যে প্লটগুলো বিক্রি করে দেওয়ায় এ বিষয়ে ওই ২৩ জন ব্যবসায়ীর পক্ষে ওসমান গনি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করলে ২০১৭ সালের ১ আগস্ট বিচারপতি নাঈমা হায়দার এবং বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ ওই ৩০টি প্লটে কোনও ধরনের কার্যক্রম না করতে ৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ জারি করেন। পরে ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও জাফর আহমেদ এর দ্বৈত বেঞ্চ আরও ১ বছরের জন্য স্থগিতাদেশ জারি করেন। এছাড়া ওই ২৩ জন ব্যবসায়ী বাদী হয়ে ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি দেওয়ানী মামলা (নং ৮৬৬/২০১৭) দায়ের করেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিরোধপূর্ণ ওই ৩০টি প্লটে আদালতের নিষেধাজ্ঞার সাইনবোর্ড সাটানো হয়।