১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চান্দু মিয়া ৭ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। মাসের কথা মনে না থাকলেও দিনটি শনিবার ছিল এটা তার স্পষ্ট মনে আছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাবা ডা. ইজাজুল হকের ওষুধের দোকানে হোমিও এবং কবিরাজি চিকিৎসা শিখতে গিয়েছিলাম। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান খবর পেয়ে এলাকাবাসীকে জানান, পাকিস্তানি বাহিনী কটিয়াদী আক্রমণ করবে। আমি দৌড়ে পশ্চিমপাড়া হিন্দু এলাকায় চলে গেলাম। সেখানে সবাইকে সর্তক করে বললাম, সবাই পালিয়ে যাও পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে আসছে। এরই মধ্যে হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে। কিন্তু সবাই পালাতে পারেনি। আত্মরক্ষার্থে আমি পুকুরে কচুরিপানার নিচে চুপ করে বসে থাকি। আমার বন্ধু ও তার পরিবারের কয়েকজনকে গুলি করে ও বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, পরে তাদের দেহ থেকে মাথা বিছিন্ন করে ফেলে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর বন্ধু রঞ্জিত দাস, তার বাবা বিদ্যাসুন্দর দাস ও ক্ষেত্র মোহন ঘোষের মাথা চটের ব্যাগে করে নিয়ে আসি। পরে দোকানের পিছনে মাটি গর্ত করে পুঁতে রাখি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাথার খুলি গর্ত থেকে তুলে ধুয়ে মুছে সযত্নে ঘরে রেখে দেই।’
মোহন ঘোষের ছেলে শিরু ঘোষ বলেন, চান্দু তার বাবার মাথার খুলি সংরক্ষণ করায় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রায় বাবার মাথা খুলি দেখতে চান্দু ভাইয়ের বাড়িতে যাই। তখনও মনে হয় বাবা বুঝি আছেন বা নেই।’
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, ‘চান্দু মিয়া ব্যক্তি উদ্যোগে যে কাজটি করেছেন সেটি অত্যন্ত প্রশসংনীয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখতে এ উদ্যোগ অন্যন্য ভূমিকা পালন করবে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাদুঘর নির্মাণের জন্য তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো।’
প্রতিবছর বিশেষ দিনগুলোতে অনেকেই আসেন গ্রাম্য চিকিৎসক চান্দুর কাছে। দেখে যান ’৭১ হানাদারদের বরর্বতার চিহ্ন। চান্দুর কাছে থাকা মাথার খুলি ও সেদিনের গল্প শুনে নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করতে পারে স্বাধীনতার কথা।
চান্দু মিয়ার স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের নৃশংসতা তুলে ধরাসহ একটি মিনি জাদুঘর করবেন তার বাড়িতে।