বন্যায় ভেসে গেছে ৪২ কোটি টাকার মাছ

বন্যায় ভেসে যাওয়া মাছের খামারহরিরামপুর উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের কান্ঠাপাড়া এলাকার দেওয়ান আব্দুর রব উদ্যমী এক উদ্যোক্তা। স্থানীয় কৃষি ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মৎস্য খামার করেন। ১৫০ শতাংশ জমির ২টি পুকুরে নলা, কাতল এবং মৃগেল মাছের পোনা ছাড়েন। সেগুলো ৮-৯ ইঞ্চির মত বড় হয়েছিল। কিছু দিন পরই বাজারজাতকরণ শুরু হতো। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন বানের জলে ভেসে গেছে। চোখের সামনে দিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকার পোনা বন্যার পানিতে মিশে গেছে। এখন তার পথে বসার অবস্থা। ব্র্যাক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবেন সেই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম। সরকারি কোনও সাহায্য পেলে হয়তো একটু ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।

আব্দুর রবের মতই দশা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের মৎস্য খামারি আল ইমরানের। নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা মৎস্য খামারটি নিয়ে ছিল রঙিন স্বপ্ন তার। খামারের আয় দিয়ে ভালোই চলছিল সাজানো সংসার। তার খামারে আরও ১৫ জন শ্রমিক কাজ করে জীবন নির্বাহ করতেন। কিন্তু সবার স্বপ্নই কেড়ে নিয়ে বানের জল।

পানিতে ভেসে গেছে আল ইমরানের ৫টি পুকুরের প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ। সব হারিয়ে তিনি এখন প্রায় সর্বস্বান্ত। আল ইমরান বলেন, কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি প্রায় ৬০০ শতাংশ জমির ৫টি পুকুরের পোনা এবং বড় মাছ বানের পানির সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। আর মাত্র ১৫ দিন পরই মাছগুলো বাজারে বিক্রির কথা ভাবছিলাম।

দেওয়ান আব্দুর রব আর আল ইমরানের মত মানিকগঞ্জের ৩ হাজার ৪৯৬ জন মৎস্য খামারির স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে বন্যা।

এদিকে উপজেলার নবগ্রাম এলাকার বাদশাহ মিয়ার ৪ বিঘা জমির ১০টি পুকুরের প্রায় ১৩৫ মণ ছোট বড় মাছ ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। এতে প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষতিতে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

কথা হয় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটগ্রাম ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের সোলায়মান খানের সঙ্গে। তিনি জানাল, আমি ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে এক বছরের জন্য চারটি পুকুর লিজ নিই। রুই, কাতলা, মৃগেলসহ আট লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের মাছের পোনা ক্রয় করে পুকুরে ছাড়ি। সাড়ে তিন লাখ টাকা মূল্যের বড় মাছও ছিল। বন্যার পানিতে সব মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। পুকুরের পাড়ও ভেঙে গেছে। সেটা ঠিক করতেও কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাগবে। বড় আশা ছিল এবার একটু লাভের মুখ দেখবো। কিন্তু বন্যায় সব ভেস্তে গেছে। 

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের জৈষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার মোট ২,০৮০টি পুকুরের মধ্যে ১,৬০৫টির মাছই বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। ভেঙে গেছে এসব পুকুরের পাড়। এতে ৯৪৩ জন মৎস্য খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। করোনার কারণে কৃষকদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা হিসেবে ব্যাংক থেকে ৪% সুদে ঋণ পাওয়ার জন্য অনেকেই আমার কাছে আসছেন। আমি তাদের সহযোগিতা করছি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. মুনিরুজ্জমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চলতি বন্যায় জেলার ৭টি উপজেলার মোট ১৪ হাজার ৪৭৯টি পুকুরের মধ্যে ৪ হাজার ৯৩১টির মাছ ভেসে গেছে, ভেঙে গেছে পুকুরের পাড়। এতে ৩ হাজার ৫১১ জন মৎস্য খামারি ৪২ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সারা জেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি যদি কোনও প্রণোদনা দেয় সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দেওয়া হবে।