দখল করে মার্কেট, শত বছরের পুরনো সড়ক বিলীনের পথে

সড়ক দখল করে মার্কেটঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ড থেকে দিলখুশাবাগ এলাকা পর্যন্ত শত বছরের পুরনো সড়ক দখল করে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট। সড়কটির প্রবেশ পথ দেখে মনে হয় পাশের মার্কেটগুলোর দোকানে ক্রেতাদের যাওয়ার জন্য এটি কর্তৃপক্ষের সরু পথ। তবে এটি কোনও মার্কেট কর্তৃপক্ষের নয়, প্রায় একশ’ বছর আগের সরকারি রাস্তা। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে দিলখুশাবাগ হয়ে শাহীবাগ ও চাপাইন এলাকাবাসীর চলাচলের জন্য এই সড়কটি নির্মাণ করা হয়।

দীর্ঘ দিন ধরে দখল করে রাখায় ১২ থেকে ১৬ ফিট চওড়া এই সড়কে যানবাহন তো দূরের কথা রিকশা বা ভ্যান নিয়েও চলাচলের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পায়ে হেঁটে চলাচল করাটাও দুস্কর হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে শাখা সড়ক হিসেবে শাহীবাগ-চাপাইন ও দিলখুশাবাগ এলাকায় যাওয়ার জন্য করা হয় সড়কটি। সিএস থেকে বিএস রেকর্ডীয় সূত্রে এই সড়কটি কোথাও ১২ ফিট আবার কোথাও ১৬ ফিট পর্যন্ত চওড়া। কিন্তু গত কয়েক বছর আগে এই সড়কের ওপরে ছাদের দোকান পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে।

সরেজমিনে সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, ভরষা সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ সড়কটির ওপর বসিয়েছে ১২টি মুরগির দোকান। সেইসঙ্গে রয়েছে অস্থায়ী কাঁচাজারও। সড়কটির দু’পাশে থাকা চৌরঙ্গি ও চকোরি সুপার মার্কেটের দোকানিরা তাদের মালামাল দিয়ে সড়কের অধিকাংশ জায়গা দখল করে রেখেছেন। এমনকি সড়কের ওপর ছাদ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট। এছাড়া চৌরঙ্গি মার্কেট কর্তৃপক্ষ সড়কটির প্রবেশমুখের দু’পাশে ৭-৮টি অস্থায়ী দোকান বসিয়েছে। এর ফলে ১৬ ফিটের এই সড়কটি এখন তিন থেকে চার ফিটে পরিণত হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও এক থেকে দুই ফিট সড়ক রয়েছে।

ম্যাপে সড়কটির অবস্থানঅবৈধভাবে সড়কের ওপর থাকা শাজাহান নামের এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি এই জায়গার জন্য ভরষা সুপার মার্কেটের মালিককে এক লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছি। এছাড়া প্রতি মাসে তাকে ৮ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকি।’ তবে এটি সড়কের জমি জেনেও তিনি অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করে আসছেন বলে স্বীকার করেন।

একই কথা বলেন রাকিব নামের আরেক মুরগি ব্যবসায়ী। তিনিও ভরষা সুপার মার্কেটের মালিকের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েই দোকান নিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘এটি সড়কের জমি জেনেও পেটের দায়ে দোকান বসিয়েছি। ভরষার মালিক বিভিন্ন লোকজনকে ম্যানেজ করবে বলে তাকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া মাসে ৬ হাজার টাকা করে ভাড়া দিয়ে থাকি।’

অন্যদিকে চৌরঙ্গি সুপার মার্কেটের মাহফুজ নামের এক দোকানি জানান, তাদের মার্কেটের অধিকাংশ দোকানি দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের ওপর মালামাল রেখে ব্যবসা করে আসছেন। তাই তিনি নিজও দোকানের সামনে সড়কের জায়গা দখল করেই মালামাল রাখেন। এতে করে সড়কের অধিকাংশ জায়গা দখল হয়ে রিকশা-ভ্যান চলাচলের জায়গাও থাকে না বলে স্বীকার করেন তিনি।

স্থানীয় আজাহার নামের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই সড়কটি প্রভাবশালী মার্কেট কর্তৃপক্ষ এমনভাবে দখল করে ফেলেছে। যে কেউ দেখলে বুঝতেই পারবেন না এটি একটি সরকারি রাস্তা। দীর্ঘ দিন ধরে এই সড়কটি দখল করে রাখলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি নিজে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান। তবে এর পরও দখলমুক্ত হয়নি সড়কটি।

সড়ক দখল করে মার্কেটএদিকে, স্থানীয় মনির ও ব্যবসায়ী জাহেদসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, এই সড়কটি প্রায় একশ’ বছরের পুরনো। এক সময় চাপাইন, রাজাশন, বিরুলিয়া, শাহীবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়ক ছিল এটি। এই সড়ক দিয়ে গরুর গাড়িতে করে সাভার বাসস্ট্যান্ডে কাঁঠালের হাট বসতো। অথচ দীর্ঘ দিনের এই সড়কটি গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় চৌরঙ্গি, চকোরি ও ভরষা সুপার মার্কেটের লোকজন দখল করে দোকনপাট বসিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বাসস্ট্যান্ড থেকে চাপাইন-শাহিবাগ এলাকার সড়কটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। তারা বিকল্প সড়ক হিসেবে এই সড়কটি ব্যবহার করতেন। তবে গত কয়েকবছর ধরে সড়কটির ওপর মার্কেট মালিকরা দোকান বসিয়ে দখল করে রাখায় যানবাহন তো দূরের কথা রিকশা-ভ্যান নিয়েও পায়ে হেটে চলাচলও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। এভাবে দখল হতে থাকলে এই সড়ক এক সময় বিলীন হয়ে যাবে। তারা দ্রুত এই সড়ক উদ্ধারের দাবি জানান।

তবে ভরষা সুপার মার্কেটের মালিক মোশারফ জানান, তিনি তার নিজের জায়গাতেই মুরগির দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়ে আসছেন। এ ব্যাপারে জানতে চৌরঙ্গি সুপার মার্কেটের মালিক আবুল বাশারের অফিসে ও বোমাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা নিপা বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এ কারণে এই সড়কটি সম্পর্কে অবগত নই। এছাড়া স্থানীয়দের দেওয়া অভিযোগ সম্পর্কেও আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে দ্রুত খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’