সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ মামলার তদন্তের বিরোধিতা করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই। যেখানে রাষ্ট্রই এ মামলার বাদী, সেখানে কিভাবে রাষ্ট্রের নিযুক্ত আইনজীবীরা এ রকম একটি মামলার তদন্ত থামিয়ে দিতে চায়? ১৬ কোটি মানুষের দাবি সালমান শাহ হত্যার বিচার হোক। কিন্তু একজন আইনজীবী কারও কারও হয়ে এমন খারাপ নজির স্থাপন করলেন। তবে তারা পারবে না। সালমান আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সেটা আজ হোক কাল হোক প্রমাণ হবেই।’
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১১/বি নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার বাসায় নিজ কক্ষে সালমান শাহকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
এ নিয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। মামলা প্রথমে রমনা থানা পুলিশ পরে ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির তদন্ত করেন। তদন্তকালে সালমান শাহর মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্ত করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিবেদনে তারা সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে বর্ণনা করে। পরে সালমান শাহর পরিবার ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি দিলে মরদেহ কবর থেকে তুলে ফের ময়নাতদন্ত করে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। তাদের প্রতিবেদনে ‘মরদেহ অত্যাধিক পচে যাওয়ার কারণে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি’ উল্লেখ করা হয়।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রায় ১৮ বছর আগের এই মৃত্যুর ঘটনা হত্যা না আত্মহত্যা তা নির্ধারণে গত বছরের জানুয়ারি মাসে মামলাটি আবারও আদালতে ওঠে। এ মামলার বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৯ জুলাই ঢাকার মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিক তদন্তে এটি হত্যা বলে প্রমাণিত হয় না। ঘটনাটি অপমৃত্যু। নায়ক সালমান আত্মহত্যাই করেছিলেন- বিচার বিভাগীয় তদন্তের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সালমানের মা নীলা চৌধুরী সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিষয়টিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে তার ব্যক্তিগত আইনজীবী মাহফুজ মিয়ার মাধ্যমে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে নারাজি দেন। নারাজি আবেদনে বলা হয়, সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। ওই আবেদন শুনে মহানগর হাকিম ওয়ায়েজ কুরুণী খান ঘটনাটি র্যাবকে দিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিলে র্যাবের এএসপি ইয়াসিন আরাফাত তদন্তে নামেন। তবে গত ৬ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু ওই মামলায় হাকিমের পুনঃতদন্তের আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন আবেদন করেন।
রিভিশন আবেদন করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা পুনঃতদন্তের নির্দেশ আটকে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি আবদুল্লাহ আবুর বিরুদ্ধে নীলা চৌধুরী এই অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বাদীর পক্ষে কথা বলা উচিত, সেখানে তিনি আসামিদের পক্ষ নিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশ আটকে দিয়েছেন। এটা তিনি করতে পারেন না।
নীলা চৌধুরীর আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘একটি মামলার তদন্ত হতে দিলে সমস্যা কী? এখানে আমরা কোনও সমস্যা দেখছি না।’
ফারুক আহমেদ বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এই মামলায় সালমানের স্ত্রী, বাসার নিরাপত্তারক্ষী, গাড়ির চালক এবং দুই কাজের মেয়ের জবানবন্দি নেয়নি। আমরা এসব দেখে অবাক হয়েছি। তাহলে তদন্তটা হলো কিভাবে?’
তিনি বলেন, ‘সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় চুরি ও ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত একটি মামলা করেন। সেই মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন মামলার আসামি রিজভী আহমেদ। ওই মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু ওই মামলার নকল কপি তোলার জন্য আবেদন করলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত থেকে তা সরবরাহ করা হয়নি। তাই ওই নথি তলব করা জরুরি। শুনানি শেষে আদালত নীলা চৌধুরীর এই আবেদন মঞ্জুর করেন। ওই পিটিশন মামলার শুনানি শেষে আদালত মামলাটির নথি তলব করেছে।’
ওই মামলায় নীলা চৌধুরীর অভিযোগ করেন, ক্যান্টনমেন্ট থানার ওই মামলায় রিজভী আহমেদ স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি নিজে ও অন্য আসামিরা পরষ্পর যোগসাজশে রাত চারটায় গভীর ঘুমে মগ্ন থাকা অবস্থায় সালমান শাহকে চেতনানাশক ইনজেকশন দেন। পরে বিদ্যুতের তার দিয়ে শ্বাসরোধ করেন। কিন্তু জবানবন্দি দেওয়া ওই যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করেনি।
এবিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ঢাকা মহানগর সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এহসানুল হক সমাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের কৌশুলি রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখবেন। কোনও ব্যক্তির স্বার্থ নয়। আদালত পুনঃতদন্তের যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটি আইনসম্মত হয়নি। তাই আমরা রিভিশন করেছি।’
তিনি বলেন, ‘একটি বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়ার পর আবার অন্য কোনও সংস্থার তদন্তের সুযোগ নেই। তাছাড়া এবিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ ছিল। সেই পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও এই আদেশ সাংঘর্ষিক। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমেই এটি সমাপ্ত হওয়ার কথা। আমরা সেটাই আদালতকে বলতে চেয়েছি।’
তবে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘এমন কোনও রুলস নেই। আদালত যেকোনও সময়, যে কাউকে দিয়ে যেকোনও বিষয় তদন্ত করাতে পারেন।’
/এআরআর/এফএ/