নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের হাশেম ফুড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় নিহতদের পোড়া মৃতদেহের জন্য অধীর প্রতীক্ষা করছেন স্বজনরা। রবিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে বেশ কয়েকজন স্বজন নিখোঁজদের ছবি নিয়ে ফ্যাক্টরির সামনে অবস্থান করেছেন। তাদের একটাই দাবি, পোড়া-গলা যা-ই হোক মৃতদেহ চাই। এজন্য লকডাউনের মধ্যেও নিখোঁজদের ছবি নিয়ে কখনও তারা ফ্যাক্টরিতে, কখনও রূপগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটছেন।
আগুনে পোড়া হাসেম ফুডের গেটের সামনে কাঁদছিলেন রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকার মিতু আক্তারের (১৪) বাবা গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে এ কারখানায় কাজ করে। বড় মেয়ের রাতে ডিউটি থাকার কারণে ঘটনার সময় সে ফ্যাক্টরিতে ছিল না। তাই সে বেঁচে গেছে। ছোট মেয়ে মিতু আমার পকেট থেকে দশ টাকা নিয়ে এসে কাজে যোগ দিয়েছিল। সেই যে আসলো, আর তো মেয়ে ফিরলো না।’ এই বলে তিনি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
গোলাম হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পাশে এসে দাঁড়ালেন লিলি বেগম (৪০)। ছেলে রিপন ইয়াসিনের (১৩) ছবি নিয়ে খুঁজতে এসেছেন। সঙ্গে এসেছেন ইয়াসিনের স্কুলের শিক্ষকও। ইয়াসিন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। লকডাউনের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় এ ফ্যাক্টরিতে কাজে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু আগুন কেড়ে নিয়েছে তাকে। আর সে বাসায় ফিরতে পারেনি।
গত তিন দিন ধরে কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গিয়ে কথা বলতে পারছিলেন না লিলি বেগম। ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ‘ছেলে কাজে যোগ দেওয়ার পর তার জন্য দুপুরে ভাত নিয়ে আসতে চাইতাম। ছেলে বলতো মা ভাত নিয়ে আসলে মানুষ জানবে আমি কাজ করছি। মানুষ জানলে শরম লাগবে। কিন্তু আজ তিন দিন ধরে ছেলের ছবি নিয়ে আসছি। আর তো ছেলে লজ্জা পায় না। ও ছেলেরে তুই কই গেলিরে...’– বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
প্রসঙ্গত, হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৫টায় আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই সময় কারখানা ভবনটিতে প্রায় চারশ’র বেশি কর্মী কাজ করছিলেন। কারখানায় প্লাস্টিক, কাগজসহ মোড়কিকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটি ফ্লোরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের দীর্ঘ সময় লাগে। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর শুক্রবার (৯ জুলাই) দুপুর সোয়া একটা পর থেকে কারখানার ভেতরে থেকে লাশ বের করে আনতে থাকেন উদ্ধারকর্মীরা। এ সময় ৪৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে, আগুনে নিহত তিন জনের লাশসহ মোট ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়। কারখানায় আগুনের ঘটনায় আরও অনেক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। ঘটনার তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে।