একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা মনোয়ারা বেগম এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও জীবনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে সুই সুঁতোয় বুনে চলেছেন স্বাধীনতার জয়গান। চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ঠাঁই পেয়েছেন ফরিদপুরের অম্বিকাপুরের এক কুটিরে। বীরাঙ্গনা হিসেবে তিনি কারও করুণা চান না, চান প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি।
মনোয়ারার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জানালেন নিজের জীবনের দুঃখগাথা। মাধবপাশার বাদলা গ্রামে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বাদলা গ্রামেই বড় হয় মনোয়ারা। সৎবাবার কারণে কিশোরী মনোয়ারার জীবন এমনিতেই পড়ে যায় টানাপোড়েনে। তার মধ্যে শুরু হলো যুদ্ধ। মনোয়ারার বয়স তখন ষোলো-সতেরো।
শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও চলে এসেছে পাকিরা। গ্রামের চারদিকে একদিন প্রচণ্ড গোলাগুলি। পরিবারে আগের দুই বোনসহ মোট ছয় ভাই-বোন মনোয়ারার। সঙ্গে ছিলেন নানী। ভয়ে গ্রাম ছেড়ে লোকজন সব পালাচ্ছে। ফাঁকা হয়ে আসছে গ্রাম। পাকিস্তানি মিলিটারিরা নদী পার হয়ে ওপারের কাউয়ারচরে যেতে পারবে না। এমনটা ভেবে মনোয়ারার নানি ওপারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ ওপারেই মনোয়ারার নানাবাড়ি।
কাউয়ারচর গ্রামের ঘাট থেকে দেড় দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর ওরা জানলো, মিলিটারিরা এখানেও এসেছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করছে। ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে। মনোয়ারার নানার বাড়িও জ্বলতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
নানার বাড়ির সঙ্গে ছিল বড় একটা কড়ই গাছ। পাশে জঙ্গল। সেই কড়ই গাছের নিচে মনোয়ারারা চুপ করে বসে দেখলো সাধের নানার বাড়ি জ্বলছে দাউদাউ করে। আরও দেখে অনেক লোককে একসঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে গুলি করে খালে ফেলে দিচ্ছে পাকিস্তানি সেনারা।
একটা গণহত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষী হয়ে রইলেন মনোয়ারা। এরপর হঠাৎ একটা শক্ত হাতের থাবা এসে পড়ে তার ওপর। চুল ধরে দাঁড় করায় মনোয়ারাকে। একদিকে মৃত্যুর ভয়, অন্যদিকে লাশের স্তুপ। এসব দেখে মনোয়ারার নানি হয়ে গেলেন পাগলপ্রায়। তখনই মারা যান তিনি।
টানতে টানতে ওরা মনোয়ারাসহ আরও চার-পাঁচটি মেয়েকে ওঠায় গানবোটে। সেখানে আরও চার জন মেয়ে। গোডাউনের পাশে বরিশাল সদর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি আবাসিক ভবন ‘ফোরকান কোয়ার্টার’। ওটার দোতলায় ওঠানো হলো সবাইকে। ফেলে রাখা হলো দীর্ঘসময়। পেটে দানাপানি নেই কারও। আতঙ্কে কাঁপছিল সবাই।
সন্ধ্যার দিকে সবাইকে ভাগ করে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। এরপর শুরু হয় পাশবিক শারীরিক নির্যাতন। ওইদিনই তিন পাকিস্তানি সেনা মনোয়ারাকে ধর্ষণ করে। তারপর থেকে দিনের পর দিন চলতে থাকে নির্যাতন। বিজয়ের আগের দিন পর্যন্ত চলে সেই নির্যাতন। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরলেও অজ্ঞানের ভান করে পড়ে থাকতেন মনোয়ারা। কিন্তু তাতেও রেহাই মিলতো না। চুল ধরে মাথা ও মুখ দেয়ালে ঘষে রক্তাক্ত করে দিতো ওরা। সেইসব কাটা দাগ এখনও আছে মনোয়ারার কপালে।
একদিন প্লেন আসা-যাওয়ার শব্দ শুনলেন। মনোয়ারার মন বললো কিছু একটা হতে চলেছে আজ। এরপর অনেকটা সময় ধরে সব নীরব নিথর। তারপর আচমকা বোমার শব্দ। সঙ্গে মুক্তিসেনাদের উল্লাস। ওরা আর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ঘিরে ফেলেছে পাকিস্তানিদের। পালাতে চেয়েছিল পাকিস্তানি হায়েনার দল। কিন্তু মুক্তিসেনারা ঘিরে ফেলে তাদের। গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রাণ ফিরে পায় বরিশাল।
তখন কারা তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়, সেটা মনে নেই মনোয়ারার। হাসপাতালে প্রথম চোখ মেলে স্বাধীনভাবে বাঁচার সাধ জাগে। হাসপাতালের স্নেহময়ী মেট্রন দিদি, ইভা সিস্টার ও মেরি পলিন দিদির কথা এখনও মনে আছে তার। প্রায় একমাস থেকে কিছুটা সুস্থ হন মনোয়ারা।
হাঁটতে হাঁটতে বরিশাল সদর হাসপাতাল থেকে মাধবপাশার বাদলা গ্রামে বাড়ির দিকে রওয়ানা হন মনোয়ারা। মনে তখন নতুন করে বেঁচে থাকার আশা। বাড়ি ফিরে বাবা-মা, ভাই-বোনের দেখা পায়। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি আসতেই টের পায়, মনোয়ারা ফিরে আসুক এটা কেউ চায় না। মনোয়ারা সোজা বাড়িতে ঢুকে পড়ে। মনোয়ারার মা দৌড়ে এসে মনোয়ারাকে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু সৎ বাবা রাগ করে বলেন ‘তুই বাড়ি আইছস ক্যা। তুই বাইর হইয়া যাইবি। মোগ দ্যাশ তোর জন্যি আর না।’
ওই বাবা মনোয়ারার মাকে সাবধান করে বলেন, মেয়েকে বাড়িতে ঠাঁই দিলে তাকেও বাড়ি ছাড়তে হবে।
বাধ্য হয়ে মা বলেন, ‘তুই অন্য কোথাও চইলা যা।’ মনোয়ারা মাকে বলে, ‘আমি কোথায় যামু?’ মা বলেন, ‘তুই যদি থাকস, সে আমারে সব পোলাপানসহ বাইর কইরা দিবো।’ বাকিদের কথা ভেবে নিজের বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যান মনোয়ারা। শুরু হয় জীবনের আরেক সংগ্রাম।
দালালের খপ্পরে পড়ে বিক্রি হয়ে যান অজান্তেই। হাত বদল হয়ে মনোয়ারার জীবন কাটতে থাকে বাগেরহাট, খুলনা, মাদারীপুর এবং সবশেষে ফরিদপুর কালিবাড়ীতে।
এরপর একদিন পরিচয় হয় এক পুলিশের সঙ্গে। ওই পুলিশ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। সব শুনে তিনি মনোয়ারাকে বিয়ে করে সামাজিক স্বীকৃতি দেন। এ সুখও স্থায়ী হলো না। মারা যান মনোয়ারার স্বামী। তারপর থেকে মনোয়ারা বেঁচে আছেন নিজের মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে।
স্বামীর পেনশনের সামান্য আয়ে ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে ভাড়া ঘড়ে থাকেন মনোয়ারা। তার ওষুধের টাকা যোগান তারই নৃত্যশিল্পী নাতি কামরুজ্জামান সুমন। বাবা বলতে বঙ্গবন্ধুকেই বুকে ধারণ করে আছেন এই বীর মাতা। কারণ বঙ্গবন্ধুই তো দিয়েছেন প্রথম স্বীকৃতি।
আড়াই বছর ধরে সেই পিতার ছবি কাপড়ের ক্যানভাসে বুনে চলেছেন মনোয়ারা। নিজে বেঁচে থাকতেই আবেগে মোড়া সূচিকর্মটি তুলে দিতে চান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, এই বীরাঙ্গনার প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের জন্য কাজ করছে সরকার। মনোয়ারার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। এ ব্যাপারে বরিশালের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করবেন বলেও জানান তিনি।