গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানাধীন রতনপুর ধোপাচালা এলাকার বনের ভেতর ফাঁকা জায়গা থেকে গত ১৬ জুন (শুক্রবার) একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, মরদেহটি মিরপুরের বেসরকারি প্রাইম ইউনিভার্সিটির ছাত্র রিয়াদ হোসেনের (২১)। ক্লুলেস এই হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে র্যাব। সংস্থাটি বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি নিহতের চাচা মো. নাঈম হোসেনকে (৩৪) গ্রেফতারও করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ জুন) রাতে র্যাব-১ (উত্তরা) এর একটি আভিযানিক দল তথ্য-প্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানাধীন মাদনপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. নাঈম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে দিনাজপুর জেলার ইন্তাজুল ইসলামের ছেলে।
র্যাব বলছে, গ্রেফতারকৃত নাঈম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, স্ত্রীর সঙ্গে পরকিয়া সন্দেহে নিজেই পরনের টি-শার্ট খুলে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ভাতিজা রিয়াদ হোসেনকে বনের ভেতর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে নাঈমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী শফিপুর আন্দারমানিক পূর্বপাড়া এলাকার একটি ড্রেন থেকে নিহত রিয়াদের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব-১ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া অফিসার) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. পারভেজ রানা জানান, নাঈম হোসেন এবং রিয়াদ দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী থানাধীন পশ্চিম নারায়ণপুর নামক একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা দূর সম্পর্কের চাচা-ভাতিজা। নাঈম ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে ছিল। সেই সময় তার স্ত্রীকে দেখাশোনার করার সুবিধার্থে রিয়াদের অবৈধ সম্পর্ক হয় বলে নাঈম হোসেন সন্দেহ করে। এই সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০২১ সালের জুন মাসের দিকে সে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে চলে আসে।
তিনি জানান, দেশে ফিরে নাঈম বিষয়টি রিয়াদের নিকট আত্মীয়দেরও জানায় এবং প্রতিহিংসার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে হত্যার জন্য মনস্থির করে। নাঈম পূর্ব পরিকল্পিতভাবে রিয়াদকে হত্যা করার জন্য ওই এলাকার জনৈক পলাশ নামে এক ব্যক্তির সাথে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিও করে। সেই মোতাবেক তাকে টাকাও দেয়। পরে নাঈম গত ২০২২ সালের জুন মাসের দিকে তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিনাজপুর হতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে।
চলতি বছর রিয়াদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে নাঈম যোগাযোগ শুরু করে বলেও জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, একদিকে নাঈম রিয়াদের সঙ্গে নিজে ফোনে যোগাযোগ করে, অন্যদিকে তাকে হত্যার জন্য ভাড়া করা পলাশকেও চাপ দিতে থাকে। একপর্যায়ে পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরেই রিয়াদকে তার মেস থেকে চলতি মাসের ১৩ তারিখে গাজীপুরের কালিয়াকৈর মৌচাক এলাকায় নিয়ে আসে। বিকালের দিকে রিয়াদ তাদের সঙ্গে দেখা করলে তিন জন একসঙ্গে চা-নাস্তাও করে। পরে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে।
তিনি জানান, ওইদিন আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে রিয়াদকে নাঈম তার ভাড়া নেওয়া পুকুরের পাড়ে নিয়ে যায় এবং পলাশকে হত্যার করার জন্য বলে। এতে পলাশ অনীহা প্রকাশ করলে নাঈম নিজেই রিয়াদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে নাঈম কৌশলে রিয়াদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মোবাইলের সকল ডাটা ডিলেট করে এবং পূর্বের ঘটনা নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু করে। এক পর্যায়ে রাত পৌনে ২টার দিকে নাঈম রিয়াদকে নিয়ে পুকুর পাড় হতে কালিয়াকৈরের রতনপুর ধোপাচালা এলাকার বনের ভেতর চলে আসে এবং নিজেই তার পরিহিত টি-শার্ট খুলে রিয়াদের গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
গত ১৬ জুন বনের ভেতরের ফাঁকা জায়গা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় লাশের পকেটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র থেকে নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।
গত ১২ জুন রিয়াদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সদর থানায় একটি জিডিও দায়ের করেছিল। গ্রেফতার নাঈমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।