‘আমারে একা কইরা দিলো, আমার বাবার মতো ভালো ছেলে হয় না। একটা সিগারেট পর্যন্ত খায় না, ওরা আমার ছাওয়ালরে পিষে মারলো।’
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর ইউনিয়নের সাহা পাড়ার নিজ বাড়িতে নিহত রিপন সাহার বাবা পবিত্র সাহা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ফোন করে রিপন বললো- বাবা, মাইক্রোবাস গাড়ি ঠিক করেছি। মেয়ে দেখার জন্য ইষ্টিকুটুম নিয়া শুক্রবার যাওয়া লাগবে। আমি সময় মতো চলে আসবানি।’
ছেলে হারানো এ বাবা বলেন, ‘শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তেলের পাম্প থেকে আমাকে ফোনে জানায়, রিপন এক্সিডেন্ট করেছে, আপনারা আসেন। গিয়ে দেখি আমার রিপন আর নাই। ওকে গাড়ি চাপা দিয়ে মাইরা ফেলাইছে। ৫ হাজার টাকার তেল নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। রিপন বাধা দিলে গাড়ির নিচে ফেলে মেরে ফেলে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। ওরা খুনি, পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলেছে।’
দুই মেয়ে এবং দুই ছেলের মধ্যে বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে রিপনের বিয়ের জন্য শুক্রবার সদর উপজেলার কল্যাণপুর মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। কয়েকদিন আগে মেয়ে পক্ষ রিপনকে দেখে পছন্দ করে গেছেন।’
শনিবার রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, উঠানে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা পবিত্র সাহা। বারান্দায় বসে বিলাপ করছিলেন বৃদ্ধ মা শিল্পী সাহা। উঠানে আহাজারি করছিলেন বড় দুই বোনসহ স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
বৃদ্ধা মা শিল্পী সাহা বলেন, ‘রিপনই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। বিয়ে করবে বলে বাড়িতে নতুন পাকা ঘর তুলেছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেলো। ওরা আমার ছেলেরে মাইরা ফেলাইছে। ওরা যেভাবে মারছে, আমিও তাদের শাস্তি দেখতে চাই।’
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ভোর সোয়া ৪টার দিকে সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড়ে করিম ফিলিং স্টেশনে কালো রঙের জিপ গাড়ি থামিয়ে ৫ হাজার টাকার তেল নেন আবুল হাসেম ওরফে সুজন (৫৫) নামের রাজবাড়ীর প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। টাকা না দিয়ে তিনি টালবাহানা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আবুল হাসেম গাড়িতে ওঠামাত্র সজোরে টান দেন চালক। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে গাড়ির নিচে পড়ে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তেল পাম্পের শ্রমিক রিপন সাহা।
এ ঘটনায় পুলিশ শুক্রবার বিকালে সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড় মুরারীপুর নিজ বাড়ি থেকে গাড়ি জব্দ এবং মালিক আবুল হাসেম সুজনকে আটক করে। পুলিশ এ সময় বাড়ি থেকে এক নারীকেও আটক করেন। দুর্ঘটনার সঙ্গে ওই নারীর কোনও সম্পৃক্ততা না থাকায় তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ।
আবুল হাসেমের দেওয়া তথ্যমতে, পুলিশ সদর উপজেলার বানিবহ নিজপাড়া গ্রাম থেকে গাড়ি চালক কামাল হোসেনকেও (৪৫) আটক করে। সে স্থানীয় আক্তার সরদারের ছেলে।
আবুল হাসেম সুজন রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এবং জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। পেশায় প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির রাজনীতি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে রিপন সাহার ছোট ভাই প্রতাপ ওরফে লিটন সাহা বাদী হয়ে শুক্রবার রাতেই আটক আবুল হাসেম সুজন ও গাড়ি চালক কামাল হোসেনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) তাপস কুমার পাল বলেন, রিপন সাহার ছোট ভাই প্রতাপ সাহার মামলা করেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।