নরসিংদীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরীকে হত্যার ঘটনাকে নাটক বলছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ওই কিশোরীকে হত্যা করে অপহরণের নাটক সাজায় তার সৎবাবা। এ ঘটনায় সৎবাবা আশরাফ আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
শনিবার (০৭ মার্চ) বেলা আড়াইটার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক। তিনি বলেন, ‘আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে কিশোরীর বাবা বলেন, কিশোরীর নানা কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন সময়ে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে তিনি একা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। হত্যার দায় অন্যদের ওপর চাপাতে অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন তিনি।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মাঝামাঝি একটি সরিষা ক্ষেত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ১৫ বছর বয়সী কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ওই রাতেই নয় জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা হয়। এ পর্যন্ত আট জনকে গ্রেফতার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ‘মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের ১০-১২ দিন আগে আসামি হযরত আলীর বাড়িতে কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর বিচার চাইতে মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য বিএনপি নেতা আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যান তারা। ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সরিষা ক্ষেত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। রাতেই নয় জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আর দুই-তিন জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা। পরে আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ আট আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের সবার আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলেও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল শুক্রবার কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তাকে মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আজ আদালতে পাঠানো হলে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।’
সৎবাবা আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই কিশোরীকে নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একজন সহকর্মীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। নির্জন ওই সরিষা ক্ষেতের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কিশোরীকে পেছন থেকে তারই ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন তিনি। শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ সেখানে রেখে বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে অপহরণের নাটক সাজান।’
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত নয় আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘তাদের মধ্যে হত্যার অভিযোগে একজন, ধর্ষণের অভিযোগে চার জন এবং অবৈধ সালিশে জড়িত থাকার দায়ে পাঁচ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সৎবাবা আশরাফ আলী, নূর মোহাম্মদ নূরা ও হযরত আলী আদালতে জবানবন্দি দিয়ে দায় স্বীকার করেছেন।’
সৎবাবা আশরাফ আলী (৪০) ছাড়াও এ মামলার গ্রেফতার আট আসামি হলো- নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আবু তাহের নামের এক আসামিকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেফতার আহম্মদ আলী দেওয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সহসভাপতি ও মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য।