উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু, জেলার হাসপাতালগুলো কতটুকু প্রস্তুত?

দেশে চলমান হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতার মধ্যে দ্রুত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করছে। এবার জুনের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং বর্ষা আসার আগেই মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। একই হাসপাতালে দুটি রোগের পাশাপাশি চিকিৎসা চলায় ক্রস-সংক্রমণের বড় ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। যার উদাহরণ দেড় বছরের শিশু তাইবা। হাম থেকে সেরে ওঠার পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছে শিশুটি। শুক্রবার (৫ জুন) সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তবে বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী আসতে শুরু করলেও এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়নি। ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনও কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেননি এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘চলতি মৌসুমে হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৫১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৮ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাকিরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে স্থানীয় ছিলেন ৩৫ জন। আর এই মৌসুমে তিন জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৩৫, নারী ছয় ও শিশু ১০ জন। বর্তমানে দু-একজন করে রোগী আসছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়লে তাদের জন্য আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালুর প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। তবে এখনও আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়নি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এদিকে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনমূলক র‌্যালি বের করা হয়েছে। শনিবার বেলা ১১ টায় নগর ভবনের সামনে থেকে র‌্যালিটি শুরু হয়। এরপর মহানগরীর দড়িখরবোনা মোড়, কাদিরগঞ্জ হয়ে পুনরায় নগর ভবনে চত্বরে গিয়ে র‌্যালিটি শেষ হয়। র‌্যালিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন। 

র‌্যালি শেষে নগর ভবন চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন রাসিক প্রশাসক। এ সময় নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘ডেঙ্গু একটি মারাত্মক মশাবাহিত রোগ হলেও সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই আসুন, নিজেদের পরিবার ও প্রিয় নগরীকে সুরক্ষিত রাখতে সবাই মিলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজশাহী সিটি করপোরেশন আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ডেঙ্গমুক্ত রাজশাহী মহানগরী গড়ে তুলতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজ আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।’

খুলনায় ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু 

চলতি বছরের শুরু থেকে ৬ জুন পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩৪৭ জন। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ছাড়পত্র নিয়েছেন ২৮৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫৮ জন।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপপরিচালক ডা. মো. আক্তারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি বছরের শুরু থেকে ৬ জুন পর্যন্ত হাসপাতালে ৬১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে ৫১ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে নিজ নিজ বাড়ি ফিরে গেছেন। গত ২৮ মে বাগেরহাটের কচুয়া থেকে দিগন্ত (১৫) নামে এক কিশোর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ওই দিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। বর্তমানে এই হাসপাতালে নয় জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। ৬ জুন একজন ভর্তি হয়েছেন।’

ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে একই হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো আইনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী থাকে প্রায় ১৪শ। এতো রোগীর ভিড়ে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট করা হয়নি। মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ৩৪৭ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে খুলনায় ৬৫ জন ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬১ জন, বাগেরহাটে ৭০ জন, সাতক্ষীরায় দুজন ও সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ জন, যশোরে ২৪ জন, ঝিনাইদহে চার জন, নড়াইলে ৪৪ জন, কুষ্টিয়ায় ২৬ জন, মেহেরপুরে ২২ জন। চুয়াডাঙ্গায় কোনও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি। ৬ জুন ভর্তি হয়েছেন যশোরে পাঁচ জন, খুলনায় একজন ও মেহেরপুরে দুজনসহ মোট আট জন।’

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

চট্টগ্রামে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শনিবার (৬ জুন) পর্যন্ত ১৮৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মহানগরে ১১৩ জন এবং জেলায় ৭১ জন। তাদের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একজন মারা যান। বর্তমানে নয় জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

এর আগে ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪ হাজার ৮৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২৫ জন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন। ওই বছর মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন। ওই বছর মারাযান ১০৭ জন। ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন। ওই বছর মারা যান ৪১ জন।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি বছর পাঁচ মাসে ১৮৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ জন করে আক্রান্ত হন। সামনে বর্ষাকাল। ওই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। ডেঙ্গু সাধারণত মশাবাহিত রোগ। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে মশা নিধন করতে হবে। মশা নিধনের দায়িত্ব পালন করে আসছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধনে জোর দেওয়ার জন্য চিঠি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি।’

ময়মনসিংহে একজনের মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ হাসপাতালে একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১১ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর সংখ্যা কম থাকায় হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড এখনও খোলা হয়নি। তবে রোগীর সংখ্যা যদি বেড়ে যায় চিকিৎসাসেবার সব প্রস্তুতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আছে।’

বরিশালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা এবং দুই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ১৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ৬ জুন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৬৯ রোগী। 

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. মো. লোকমান হাকিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‌‘এ‌ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা এবং বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ওই সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী। তবে ওই সময় মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনও রোগীর মৃত্যু হয়নি।’

প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১ জানুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত হাসপাতালে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে ছাড়পত্র নিয়েছেন আট জন। ওই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনও রোগীর মৃত্যু হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন চার জন রোগী। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট করা হয়নি। মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

রংপুরে নেই প্রস্তুতি

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৬ জুন পর্যন্ত দুজন ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত কেউ ডেঙ্গুতে মারা যায়নি। এই দুজনেই এই মৌসুমে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলা হয়নি। রোগী বাড়লে খোলা হবে। এখন পর্যন্ত আগাম কোনও প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। রোগী বাড়লে তখন সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে।’

সিলেটে খোলা হয়েছে ডেঙ্গু কর্নার

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। তবে আক্রান্ত কোনও রোগী নেই। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রশিদ মুনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শনিবার সিলেটে ডেঙ্গু সচেতনতায় র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাসপাতালের নতুন ভবনে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। এতে ২০টি শয্যা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও রোগী শনাক্ত হয়নি। আমাদের প্রস্তুতি আছি।’

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের রাজশাহী প্রতিনিধি দুলাল আবদুল্লাহ, খুলনার হেদায়েৎ হোসেন, চট্টগ্রামের নাসির উদ্দিন রকি, ময়মনসিংহের আতাউর রহমান জুয়েল, বরিশালের সালেহ টিটু, রংপুরের লিয়াকত আলী বাদল ও সিলেটের মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।