কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একটি বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষে মাসুদ মিয়া (৩০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। টানা ছয় ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। আহতদের মধ্যে ২০ জনকে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সকালে দুই পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামের মাঠে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বেলা ২টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নিহত মাসুদ মিয়া পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি মিরারচর গ্রামের বাসিন্দা। ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক উম্মে হাবিবা বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাসুদ মিয়াকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু হয়েছিল। শরীরে রক্তপাতের চিহ্ন ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’
সংঘর্ষের কারণে সকাল ১০টা থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ আছে। ভৈরব স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ইউসুফ বলেন, ‘মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের মধ্য দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ গেছে। সংঘর্ষকারীরা রেলপথ ব্যবহার করায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।’
এ কারণে জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস কুলিয়ারচর স্টেশনে এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কিশোরগঞ্জগামী আন্তনগর এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ভৈরব স্টেশনে আটকে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মাঝ দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দুই গ্রামের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের উপস্থিতির কারণে বাজারটি দীর্ঘদিন ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। তবে সরকারি কোনও নথিতে বাজারটির নির্দিষ্ট নাম ছিল না।
বিরোধের সূত্রপাত ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সেখানে বাজারের নাম শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এর প্রতিবাদে একই বছরের ৯ জুলাই মিরারচর গ্রামের কয়েকজন সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। বাজারের অসংখ্য দোকানপাটও ভাঙচুর করা হয়। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে তখনকার সংঘাত থামলেও দুই গ্রামের সামাজিক সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি। পরে বিভিন্ন বিরোধও বাজারের নামকরণ ইস্যুর সঙ্গে জড়িয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকে।
গত কয়েক দিন আগে বাজারে দুই এলাকার কয়েকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এর জেরে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রবিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম দুই গ্রামের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষের ১০ জন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে দ্রুত সভা করে বাজারের নাম চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সভা না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষ সংঘাতে জড়াবে না বলে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে।’
মিরারচর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার দাবি, বাজারটি গড়ে ওঠা ও পরিচিতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরও সমান ভূমিকা রয়েছে। তাই বাজারের নাম ‘মিরারচর বাজার’ অথবা ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ রাখা উচিত।
অন্যদিকে আকবরনগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার বক্তব্য, বাজার ও বাসস্ট্যান্ড সরকারি নথি অনুযায়ী আকবরনগর মৌজার মধ্যে অবস্থিত। তাই এর নাম এককভাবে ‘আকবরনগর বাজার’ হওয়াই যৌক্তিক।
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল কবির বলেন, ‘সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ কাজ করছে। তবে বেলা ২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন মাসুদ মিয়া। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিমন বোস বলেন, ‘বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষে মাসুদ মিয়া নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে কাজ করছে।’
ভৈরব সার্কেল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ বলেন, ‘বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে আকবর নগর ও মিরারচর গ্রামের লোকদের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করি। কিশোরগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক।’