ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ২ সার্ভিস সেতু খুললো

নতুন দুই সেতুতে লাগবে না টোল, সুবিধা পাবে কত জেলার মানুষ

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটারের পৃথক দুটি সার্ভিস সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে ফিতা কেটে এর উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। পরে সেতু দুটি দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। দুই লেনবিশিষ্ট এসব সেতুতে কোনও টোল দিতে হবে না এবং সব ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের দীর্ঘতম উড়ালসড়ক ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। একসময় প্রকল্পটির কাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করে কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজের মান ও বাস্তবায়নের গতি সন্তোষজনক। সাড়ে তিন বছরে প্রকল্পের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ও পরিধি সংশোধন করে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সংশোধিত প্রকল্পটি নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরও একটি অংশের কাজ শেষ হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সভাপতি চি উয়ে এবং প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম।

তুরাগ পারাপারে টোল লাগবে না

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তুরাগ নদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে আশুলিয়া বাজার থেকে ধউর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কটি আর রাখা হচ্ছে না। ফলে নতুন সার্ভিস সেতু ব্যবহার করে টোল ছাড়াই তুরাগ নদ পার হওয়া যাবে। সব ধরনের যানবাহন চলবে। 

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এক্সপ্রেসওয়ের শুধু মাঝের চার লেনে টোল নেওয়া হবে। তবে আজ যে অংশ চালু হয়েছে, এতে চলাচলে টোল লাগবে না।’

চালক ও স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ চালু হওয়ায় যানবাহনের চালক ও স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। যানবাহন চালকরা বলছেন, সড়কটি চালু হওয়ায় আশুলিয়া এলাকায় যানজট ও যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে।

সাইফুল ইসলাম নামে এক পিকআপ চালক বলেন, ‘আগে রাস্তায় অনেক যানজট ছিল। এখন কমে যাবে। অনেক ভালো লাগছে। এখন দ্রুত গন্তব্যে যেতে পারবো।’ 

আশুলিয়ার বাসিন্দা দীপংকর দাস বলেন, ‘আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে অবশেষে চালু হয়েছে। এতদিন অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। আশা করছি, এখন যানজট থেকে অনেকটা রক্ষা পাবো।’ 

স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল হোসেন বলেন, ‘যানজট নিরসনে এক্সপ্রেসওয়ে অনেক ভূমিকা রাখবে। উত্তরা থেকে আশুলিয়া আসতে প্রচুর ভোগান্তি হতো। এখন আর ভুগতে হবে না।’

প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ, সুবিধা পাবেন কারা

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পুরো কাজ শেষ হলে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের আবদুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল এবং ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ডিইপিজেড) সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এতে রাজধানী থেকে দ্রুত বাইরে যাওয়া ও ঢাকায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গসহ ৩০টি জেলার প্রায় চার কোটির বেশি মানুষ এই এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা পাবেন। পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সহজ ও দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি যানজট কমাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) শূন্য দশমিক ২১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রধান ভৌত উপাদানের মধ্যে রয়েছে ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ১০ দশমিক ৮৩৪ কিলোমিটার র‍্যাম্প, ১৬ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার অ্যাট-গ্রেড সড়ক, ৪ দশমিক শূন্য ৫ কিলোমিটার বাইপাইল ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ এবং মোট ৭ দশমিক ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সেতু। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশদ্বার আশুলিয়া হয়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের প্রায় পাঁচ বছর পর ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলায় আশুলিয়া ও এর আশপাশের মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। পরে কাজের গতি বাড়ানো হলে প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি জুলাই পর্যন্ত ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় প্রায় ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।