মুসলিম না হিন্দু বিতর্কের অবসান, ইসলামী রীতিতে দাফন করা হলো সেই ব্যক্তিকে

আদালতের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লালের (৩০) লাশ ইসলামী রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদালতের নির্দেশে ইসলামী রীতি অনুযায়ী শুভর লাশ দাফনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আজ রাতে তার লাশ মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম বলেন, গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাসের সুরতাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ হস্তান্তরের সময় তার মা, ভাই ও স্ত্রী দাবি করেন তিনি মুসলিম হয়েছেন। তবে প্রথম দিকে আমরা তাকে হিন্দু বলে জেনেছি। তার বাবা নিহত শুভর ধর্ম হিন্দু বলে দাবি করেন। পরে এই বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অথচ ২০০৩ সালে শুভর মা ও তার বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর শুভর মা তার সব সন্তানদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় শুভর ইসলামিক নামকরণ করা হয় বিল্লাল হোসেন। তার ভাই সজিব থেকে নাম পরিবর্তন করে ইব্রাহিম, তার বোন ও মায়ের নাম আয়েশা রাখা হয়।

তিনি বলেন, এ নিয়ে নিম্ন আদালতে জটিলতা সৃষ্টি হলে লাশ হস্তান্তর করতে পারিনি, হিমঘরে লাশ রাখা হয়। পরে তার মা ও স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে গিয়ে আবেদন করেন। আদালত ইসলামি শরিয়া মোতাবেক লাশ দাফনের পক্ষে নির্দেশনা দেন। সেই আদেশ অনুযায়ী নিহতের স্ত্রী ও স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয় ও ইসলামী শরিয়া মোতাবেক লাশ দাফন করা হয়।

এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার মলাশ ও পাঁচটি গুলির খোসা, ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

পরে সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন (৪৫), সিয়াম আহমেদ সিজান (২১) ও সোহান (২৪) নামে তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে ও তদন্তে জানা গেছে, ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীকে দিয়ে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে এনে ১০-১২ জনের একটি দল ঘিরে ফেলে। পরে তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়।

পরে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রিমান্ডে থাকা সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নবাব সলিমুল্লাহ রোডের রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান ফটকের পূর্ব পাশে ঝোপ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করে পুলিশ।

এদিকে নিহত শুভর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। নিহতের সনাতন ধর্মাবলম্বী বাবা হিন্দু রীতি অনুযায়ী ছেলের সৎকারের দাবি করেন। অন্যদিকে স্ত্রী, মা, ভাই ও বোন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন জানিয়ে বিল্লালের লাশ ইসলামী রীতি অনুযায়ী দাফনের দাবি জানান।

এ নিয়ে প্রথমে নিম্ন আদালতে শুনানি হয়। পরে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লালের স্ত্রী জ্যোতি হাইকোর্টে রিট করেন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মুহাম্মদ ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের বেঞ্চ শুনানি শেষে তার লাশ স্ত্রী জ্যোতির কাছে হস্তান্তর এবং ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী দাফনের নির্দেশ দেন।

রিটকারীর আইনজীবী জুয়েল আজাদ জানান, ২০০৩ সালের ২৬ জুন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা এফিডেভিটে শুভ, তার মা পার্বতী রাণী দাস ও ভাই সজীব চন্দ্র দাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে শুভর নাম রাখা হয় বিল্লাল। তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। পরে রূপগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের মেয়ে জ্যোতিকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে করেন বিল্লাল। তাদের দুই বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।

আইনি জটিলতার কারণে এত দিন শুভ ওরফে বিল্লালের লাশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে হিমঘরে রাখা হয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশের পর লাশটি স্ত্রী জ্যোতির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পুলিশি পাহারায় জানাজা শেষে মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শুভর দাফন শেষে তার মা আয়েশা বেগম কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেকে ডেকে এনে গুলি করে হত্যা করে। নিহতের পর আমার ছেলের লাশ দাফন করতে পারিনি। ৯ দিন হয়রানির পর আদালতের নির্দেশে আজ লাশ দাফন করেছি।

বিচার দাবি করে তিনি বলেন, আমি এতিম হয়েছি। আমর দেড় বছরের নাতিন এতিম হয়েছে। আমি আসামিদের ফাঁসি চাই। আমার ছেলে চলে গেছে, সে আর ফিরে আসবে না। আমার ছেলে কবরে শুয়ে আছে, আপনারা পারলে আমাকে ছেলের সঙ্গে কবরে দিয়ে আসেন। আসামিরা আমার ছেলের পরিবর্তে আমাকে গুলি করে মারতো, তারা কেন আমার ছেলেকে মারলো?