ঢাকার আশুলিয়ার প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইলের কারখানা চত্বরে বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আট জনে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে কারখানা চত্বরে বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কাভার্ড ভ্যানে করে কারখানার জন্য গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার সম্পূর্ণ অনিরাপদ বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তারা চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ওই কারখানার চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারের গাড়িতে বিস্ফোরণ থেকে আগুন লেগে যায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী একটি দর্জি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জয়নব বেগম (৫৫) নামে এক নারীর ওপর উড়ে গিয়ে পড়ে সিলিন্ডার। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পাশাপাশি আহত ও দগ্ধ হন অন্তত ২৬ জন।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘটনাস্থলে থাকা কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে একটি মরদেহ, নিচে তিনটি ও পাশে আরও একটি মরদেহ পাওয়া যায়। এতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় জনে। আহতের মধ্যে তিন জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে রবিবার রাতে একজনের মৃত্যুর খবর আসে। আর সোমবার সকালে আরও একজনের মৃত্যুর খবর এলো। এতে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট জনে।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম বলেন, ‘গুরুতর আহত অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তিন জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন চিকিৎসাধীন আছেন। এখনও মৃতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।’
আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন অর রশীদ জানান, রবিবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের আহত অবস্থায় ২৫ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিন জনকে ঢামেকে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে দুই জন মারা গেছেন এবং একজন চিকিৎসাধীন আছেন।
রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করে। এ ছাড়া কারখানার অদূরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন আরও এক নারী। আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে আহত ২৫ জনকে নেওয়া হয়। আঘাত গুরুতর হওয়ায় রাতেই তিন জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কারখানা চত্বরে যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছিল, সেখানে এলোমেলোভাবে সিলিন্ডারভর্তি কাভার্ড ভ্যানগুলো পড়ে আছে। কয়েকটি পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট। আশপাশের উৎসুক জনতা কারখানার প্রাচীরের বিভিন্ন স্থানের ছিদ্র দিয়ে এবং ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করছেন। তবে গণমাধ্যমকর্মী ও লোকজনকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
কীভাবে ঘটলো বিস্ফোরণ
ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে কারখানার সীমানা প্রাচীরের পাশে লরি থেকে গ্যাস সিলিন্ডার আনলোড করার কাজ চলছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই আনলোডের সময়ই কোনও ত্রুটি বা অসাবধানতার কারণে সিলিন্ডারে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে।
একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর কাভার্ড ভ্যানে থাকা অন্যান্য সিলিন্ডার এক এক করে চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক বিস্ফোরণ শুরু হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, জ্বলন্ত সিলিন্ডারের টুকরো লোহার বোমার মতো প্রায় ২০০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে। আশপাশের বাসাবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী পথচারী বাতাসে উড়ে আসা সিলিন্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক (জোন-৪) হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা আমাদের দৃষ্টিতে নিরাপদ নয়। ঘটনা খতিয়ে দেখতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকার সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানকে সভাপতি করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থলে ১০ থেকে ১২টি কাভার্ড ভ্যান ছিল। পরে কয়েকটি ভ্যান সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে সিলিন্ডারবাহী ৯টি কাভার্ড ভ্যান পেয়েছেন। সব কটি ভ্যানের সিলিন্ডার গ্যাসভর্তি ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রতিটি কাভার্ড ভ্যানে ৯০ থেকে ১০০টি করে সিলিন্ডার ছিল। এভাবে কাভার্ড ভ্যানে গ্যাস সিলিন্ডার রাখার বা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা নয়। কারখানাটির সেফটি প্ল্যান যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এভাবে গ্যাস ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে অনিরাপদ।’
৩০০ গজ দূরের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত
বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে একটি দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের দেয়াল ভেদ করে লোহার একটি টুকরা ঢুকে যায়। এতে দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং দুটি বড় বৃত্তাকার ছিদ্র হয়েছে। এ সময় ওই বাসায় ছিলেন গৃহিণী নাজমা বেগম ও তার মেয়ে।
নাজমা বেগম বলেন, ‘আমি রুমেই ছিলাম। ফোনে একটা কল আসাতে পাশের ডাইনিং রুমে গেছি কথা বলতে। দুই মিনিট পর বিল্ডিংয়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে অবস্থা হয়েছে। রুমের আসবাবপত্র ও দেয়ালের ইট ভেঙে ছড়িয়ে গেছে। ভয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে দ্রুত দৌড়ে নিচে নেমে আসি। ভবনটি করেছি এখনও ছয় মাস হয়নি। এর মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটলো। আমাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’
নাজমার বাড়ির মতো আশপাশের বিভিন্ন জায়গায়ও লোহার টুকরা ছিটকে গিয়ে ভবনে আঘাত হেনেছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে সিলিন্ডারও ছিটকে পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি মাজারসংলগ্ন বাড়িতে তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিটকে পড়ে। এতে ওই বাড়ির টিনের চালের কিছু অংশ দুমড়েমুচড়ে গেছে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম বলেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। এখনও এ ঘটনায় কোনও মামলা হয়নি।