চট্টগ্রামে এক নারীর আইফোন চুরির মামলার তদন্তে গিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কেনা আইফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তিনি যে আইফোনটি কিনেছেন, সেটিকে চোরাই বলছে পুলিশ। সেটি উদ্ধারের কথা বলে তার কাছ থেকে আরও ১৭ হাজার টাকা নিয়েছেন শ্রীপুর থানার এসআই মেহেদী হাসান টিটু। চোরাই মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের খরচের কথা বলে ওই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষার্থী।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামে শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আয়ানের বাড়িতে গিয়ে তার কেনা আইফোনটি নিয়ে যান এসআই মেহেদী হাসান টিটু। এ সময় ট্র্যাকিং খরচের কথা বলে তার কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন আয়ান।
আবুল হাসনাত আয়ান ওই গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।
আয়ান বলেন, ‘গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের লেভেল-৪, ব্লক-ডি, দোকান নম্বর ৪ডি/০১৬এ-এর অ্যাপল হট (Apple Hot) থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটি ব্যবহৃত “আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স” কেনেন। কেনার ক্যাশ মেমো ও ফোনের বাক্স তার কাছে রয়েছে এখনও।
তিনি জানান, বাড়িতে এনে আইফোন চালুর পর গত শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এসআই মেহেদী হাসান টিটু তার বাড়িতে যান। এর আগের দিন ফোন করে তার বিস্তারিত তথ্য নিয়েছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। বাড়িতে গিয়ে এসআই তাকে জানান, তার কেনা ফোনটি চোরাই। চট্টগ্রামে এক নারীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তার আইফোন, টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ফোনটির সংশ্লিষ্টতা আছে।
আয়ানের ভাষ্য, তিনি এসআইকে ফোন কেনার ক্যাশ মেমো ও বাক্স দেখান। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তার সামনেই সংশ্লিষ্ট দোকানে ফোন করে কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপরও এসআই তাকে বলেন, ফোনটি যেহেতু তার কাছে পাওয়া গেছে, তাই সমস্যাটি তারই। এটি চোরাই ফোন।
আয়ান জানান, ঘটনার সময় তার মামাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি এসআইকে বলেছেন, ফোনটি যে দোকান থেকে কেনা হয়েছে, সেখানে অভিযান চালানো যেতে পারে। আয়ানের কাছে কেনার প্রমাণও রয়েছে। তারপরও তাকে ফোনসহ নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করার খরচের কথা বলে তার কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেন এসআই।
আয়ান আরও বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে নিয়ে আমি যমুনা ফিউচার পার্কের অ্যাপল হট থেকে নগদ এক লাখ পাঁচ হাজার টাকায় ফোনটি কিনেছি। কেনার সব কাগজপত্র আমার কাছে রয়েছে। দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেও ফোনটি কেনার বিষয়টি প্রমাণিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি বৈধভাবে ফোনটি কিনেছি, অথচ আমার কেনা ফোনই নিয়ে গেলেন শ্রীপুর থানার এসআই মেহেদী হাসান টিটু। আবার আমার কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকাও নিলেন। আমি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। আমার টাকা উদ্ধারে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। সেই দোকানেও অভিযান চালায়নি।’
আয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনটি নেওয়ার সময় তিনি এসআইকে পুরো কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করে রাখতে বলেন। এসআই নিজের মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করলেও তাকে সেই ভিডিওর কপি দেননি।
এ ব্যাপারে এসআই মেহেদী হাসান টিটু বলেন, ‘গত ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের এক নারীকে তার পরিচিত লোকজন বাসায় নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন। পরে তার বাসা থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও একটি আইফোন নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ঘটনায় নারী একটি সিআর মামলা করেন। পরে মামলাটি গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি থেকে আমাকে মুঠোফোনটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ফোনটি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি আমি।’
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী দোকান থেকে ফোনটি কিনে থাকলে তিনি বৈধ ক্রেতা—বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষার্থীর আর্থিক ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে দেওয়া হবে জানতে চাইলে এসআই শ্রীপুরের এক সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই সাংবাদিক আমাকে ভালোভাবে চেনেন।’ সেইসঙ্গে গাজীপুর জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার পরিচয় দিয়ে এসআই বলেন, ‘আমি তার ভাগনে।’
শিক্ষার্থীর আর্থিক ক্ষতির মধ্যে আরও ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই বলেন, ‘আমার সঙ্গে দেখা করে চা খেয়ে যাইয়েন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এসআই ১৭ হাজার টাকা কেন নেবেন? মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের খরচের কথা বলে টাকা নিতে পারেন না এসআই।’