১২৬ বছরের ইতিহাস, ২৫ লাখ টাকার ৫২০ কেজির প্রতিমা, যেভাবে হয় বিসর্জন

মাটির বদলে ধাতুতে গড়া দুর্গা প্রতিমা। ওজন ৫২০ কেজি, উচ্চতা আট ফুট। ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী বণিকবাড়িতে এমনই এক দুর্গা প্রতিমা ঘিরে প্রতি বছর দুর্গাপূজায় জড়ো হন দর্শনার্থীরা। তবে শুধু প্রতিমার নির্মাণশৈলীই নয়, পূজা শেষে বিসর্জনের প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রমও বাড়িটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

এখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। প্রতীকী দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় বাড়ি ও পূজামণ্ডপ। উৎসব শেষে প্রতিমাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

২০১৭ সালে নির্মিত অষ্টধাতুর প্রতিমাটি তৈরি করতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল। এতে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা। দেবী দুর্গার সঙ্গে প্রতিমায় রয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের মূর্তি। বাংলার প্রচলিত রীতিতে দেবীর অবয়বের পাশাপাশি চোখের নকশায়ও রাখা হয়েছে বাঁশপাতার আদল। প্রতিমাটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে স্বর্ণ, রুপা, পারদ, দস্তা, সীসা, লোহা, রাং ও তামা। বণিক পরিবারের স্বত্বাধিকারী সুকান্ত বণিকের ভাষ্য, পরিবারের সদস্যরাই প্রতিমাটি তৈরি করেছেন।

ঐতিহ্যবাহী বণিকবাড়িতে এমনই এক দুর্গা প্রতিমা ঘিরে প্রতি বছর পূজায় জড়ো হন দর্শনার্থীরা

সুকান্ত বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘আগে মাটির প্রতিমা তৈরি করে পূজা দেওয়া হতো। পরিবারের সদস্য কমে যাওয়ায় স্থায়ী একটি প্রতিমা তৈরির চিন্তা আসে। পরে আমরা নিজেরাই এটি তৈরি করেছি। পরিবারের সদস্যদের পূজা-অর্চনার জন্যই প্রতিমাটি তৈরি করা হয়েছে, বিক্রির জন্য নয়। তবে কেউ অর্ডার দিলে এমন প্রতিমা তৈরি করা সম্ভব। এ ধরনের প্রতিমা নির্মাণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।’

বণিকবাড়ির দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় ১২৬ বছরের। তবে ধাতুশিল্পের সঙ্গে পরিবারটির সম্পর্ক আরও পুরোনো। প্রায় ২০০ বছর ধরে তারা তামা, কাঁসা ও পিতলের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন। বাড়ির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কাঁসা ও পিতলের তৈরি দেবদেবীর প্রতিমা, নটরাজের মূর্তি এবং নানা ধরনের কারুকাজ। পরিবারের এই শিল্প ঐতিহ্যের ছাপও দেখা যায় বাড়িটির বিভিন্ন স্থাপনায়।

শুধু প্রতিমার নির্মাণশৈলীই নয়, পূজা শেষে বিসর্জনের প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রমও বাড়িটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে

একসময় বণিকবাড়িতে মাটির প্রতিমা তৈরি করেই দুর্গাপূজা হতো। পরে পরিবারের সদস্য ও লোকবল কমে আসায় স্থায়ী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের বাস্তবায়ন ঘটে ২০১৭ সালে অষ্টধাতুর প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে প্রতি বছর পূজার আগে প্রতিমাটি নতুন করে সাজানো হয়।

পূজার পাঁচ দিন বাড়ি ও পূজামণ্ডপ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকায় প্রতিমাটি দেখতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম ঘটে। কেউ আসেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। প্রতিমা দেখার পাশাপাশি বাড়িটির নকশা ও কারুকাজের সামনে ছবি তোলেন অনেকে।

ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী বণিকবাড়ি

সাভারের রেডিও কলোনি এলাকা থেকে প্রতিমাটি দেখতে এসেছেন খালিদ হোসেন ও তার বন্ধু দীপঙ্কর দাস। পরিচিতজনদের কাছে এই ব্যতিক্রমী প্রতিমার কথা শুনেই তারা এখানে আসেন।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে আসা বৃষ্টি সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব জায়গায় মাটির প্রতিমা দেখা যায়। এখানে ধাতু দিয়ে এমন প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। এটি দেখতে এসে খুব ভালো লাগছে।’

সুকান্ত বণিক জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থী ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও প্রতিমাটি দেখতে এসেছেন। প্রতিমাটির সৌন্দর্য নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, এই প্রতিমার প্রতীকী দর্পণ বিসর্জন হয়। পূজার দিনগুলো ছাড়া প্রতিমাগুলো সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় বাড়ি ও পূজামণ্ডপ। উৎসব শেষে প্রতিমাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়

ধাতুশিল্পের দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থায়ী প্রতিমা এবং বিসর্জনের ভিন্ন রীতির সমন্বয়ে ধামরাইয়ের বণিকবাড়ির দুর্গাপূজা পেয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। প্রতি বছর পূজার সময় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি সেই ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহেরই প্রতিফলন।