সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি সুইটি আক্তারের (২৫) টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর লোকমুখে শোনার পর থেকে কাঁদছেন বাবা-মা। দুই মাস পর দেশে ফেরার কথা বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন সুইটি। এর মধ্যে এমন খবর শুনছেন তারা। তবে বাংলাদেশ কিংবা সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে কেউ এখন পর্যন্ত সুইটির মৃত্যুর বিষয়টি বাবা-মাকে জানায়নি। ফলে তারা এখনও নিশ্চিত হতে পারছেন না মেয়ে জীবিত নাকি মৃত।
সুইটির বাবা-মা জানিয়েছেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বিষয়টি বাবা-মাকে জানানো হয়নি। ফলে এখনও তারা মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। এর মধ্যে লোকমুখে মৃত্যুর কথা শুনে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন বাবা-মা।
সুইটি আক্তার মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের এক গ্রামের দিনমজুরের ছোট মেয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। এরপর পরিবারের চাপে আরেকজনকে বিয়ে করেন। কিন্তু স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং বাবার সংসারের অভাব দূর করতে তিন বছর আগে সৌদিতে যান। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেফতার হন।
তখন সুইটি পরিবারকে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে তার সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। তবে মারামারিতে তিনি জড়িত ছিলেন না। এ ঘটনায় ওই নারীদের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে থাকলেও মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। কোনও কারণে ফোন দিতে না পারলে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন বাবা-মাকে।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় সৌদির থেকে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে ফোন করেন সুইটি। মা বাড়ির বাইরে থাকায় তার ভাগনির (বোনের মেয়ে) সঙ্গে কথা হয়। এ সময় বাবা-মা ও পরিবারের সবার খোঁজখবর নেন এবং পরে মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। এরপর আর ফোন করেননি। এর আগের সপ্তাহে বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তখন আশ্বস্ত করে বলেছিলেন দুই মাসের মধ্যে দেশে ফিরতে পারেন। কারণ তার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া নারীরা কারামুক্ত হয়েছেন।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর (গত বুধবার) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তারা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
ঋণ করে সৌদি পাঠানো হয়েছিল
মঙ্গলবার সকালে সুইটি আক্তারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউবা প্রতিবেশী। সুইটির মা-বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন। বাবা জানিয়েছেন তার পাঁচ মেয়ে। তাদের মধ্যে সুইটি সবার ছোট। ২০০১ সালের ১১ আগস্ট জন্ম তার। ২০১৬ সালে একই উপজেলার তরফপুর গ্রামের বাসিন্দা সেলিম মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। পারিবারিক কলহের জেরে এক বছর পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০১৮ সালে নিজ গ্রামের শিপন মিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। ছয় মাস পর শিপন সৌদিতে গিয়ে তাকে ডিভোর্স দেন এবং আবার বিয়ে করেন। ফলে সেই সংসারও ভেঙে যায়।
এ অবস্থায় অভাবের সংসার এবং মানসিক অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে পরিবারের হাল ধরতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুইটি। ২০২৩ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সৌদির আল মাজাল আল-আরাবি গ্রুপ কোম্পানির অধীনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজে নিয়োজিত ছিলেন সুইটি। সেখানে চাকরি করে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতেন। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
বাবা জানিয়েছেন, সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাদের নিয়মিত কথা হতো। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দি থাকার কথা জানায়। ওর (সুইটি) কয়েকজন বান্ধবী অবৈধভাবে নাকি একটি গাড়ি কিনেছিল, সেটি নিয়ে তাদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। এই কারণে অন্যদের সঙ্গে মেয়েকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনও কোনও সময় এক সপ্তাহ আবার কোনও সময় এক মাস পর কথা হতো। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’
বাবা বলেন, ‘দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ শুরু করে। তখনও জেলে থাকার কথা বলেছিল। ফোন না দিলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিল। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। মাঝে-মধ্যে কথা হতো।’
মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কেউ কিছুই জানায়নি
সুইটি আক্তারের বাবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। একদিন মাটি কাটি, আবার আরেকদিন ভ্যান চালাই। এভাবেই আমার পাঁচ মেয়েকে বড় করেছি। অভাবের সংসারে ছোট মেয়ে সুইটিকে দুবার বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ে টেকেনি। এ জন্য পরিবারের হাল ধরতে সৌদিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আমার ছোট মেয়ে। তখন দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদিতে পাঠানো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মক্কা নগরীর একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতো। সেখানে কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে নাকি ঝগড়া হয়েছিল। কিন্তু আমার মেয়ে ঝগড়ার মধ্যে ছিল না। তারপরও পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলেছিল। এরপর থেকে মেয়ে জেলে ছিল। মাঝে-মধ্যে ফোনে কথা বলতো। কয়েকদিন আগে বলেছিল, দুই মাস পর দেশে ফিরবে। কিন্তু গত ১৩ অক্টোবরের পর আর কথা হয়নি। এখন অনেকেই বলছেন মেয়ের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ব্যাপারে কেউ আমাদের কিছুই জানায়নি, এমনকি মেয়েও কখনও আমাদের ওসব বিষয়ে কিছু বলেনি। এখন লোকজন যেসব বলে বেড়াচ্ছে, তাও বলেনি কখনও।’
অভিযোগ বিশ্বাস হচ্ছে না বাবা-মায়ের
বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে মসজিদের ভেতরে কোনও অনৈতিক কাজ করেনি। এ ধরনের অভিযোগ মিথ্যা। এসব সত্য হলে মৃত্যুর আগে অন্তত একবার হলেও মেয়ে বলতো আমাদের। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি এখনও দেশের কিংবা বিদেশের কোনও প্রশাসনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারিনি আমরা। আমার মেয়েকে ফেরত চাই। মেয়েকে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
মেয়ের কোনও খোঁজ পাচ্ছি না
সুইটির মা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় সৌদির কারাগার থেকে আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করেছিল সুইটি। আমি বাড়ির বাইরে থাকায় তার ভাগনির সঙ্গে কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছিল। এরপর থেকে আর মেয়ের কোনও খোঁজ পাচ্ছি না। আমি তো মা, আমার কেমন লাগে, এটা আমি জানি। অনেকেই বলছে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটা আমি বিশ্বাস করি না। ওর সঙ্গে আরও কয়েকজন জেলে ছিল। তারা বের হয়েছে বলে জানিয়েছিল। বলেছিল আগামী দুই মাসের মধ্যে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরবে। সেখানে থাকা তার বান্ধবীরাও বলেছিল সুইটিও জেল থেকে বের হবে। এর মধ্যে এক সপ্তাহ ধরে মেয়ের কোনও খোঁজ পাচ্ছি না। আগে সপ্তাহে অন্তত একদিন কথা বলতো। কিন্তু গত এক সপ্তাহে একবারও ফোন করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ে বলেছিল সেখানে সামান্য মারামারি হয়েছে, এজন্য মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। এখন লোকমুখে শুনছি অন্য কথা। যদি সেজন্য আমার মেয়েকে সৌদি সরকার মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে, তাহলে সে দেশের সরকার কেন একবারের জন্যও আমাদের জানাইলো না। শুনছি, বাংলাদেশ সরকারও কিছু জানে না। আমরা এখনও জানি না, মেয়ে বেঁচে আছে নাকি মেরে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ—আমার মেয়েকে ফেরত চাই।’
স্থানীয়দের মাঝেও উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুইটির পরিবার খুবই দরিদ্র। দিন আনে, দিন খায়—এমন পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন সুইটি। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে থাকলে পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। পাশাপাশি তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করারও দাবি জানান স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ফজলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েটি জেলে রয়েছে, বিষয়টি আগেই শুনেছিলাম। আমরা এতদিন জানতাম জেলে। কিন্তু এখন মৃত্যুদণ্ডের পর যেসব ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, এর সঙ্গে সুইটির ছবির কোনও মিল নেই। যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। আর যদি জীবিত থাকে, তাহলে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হোক।’
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েটির বাড়ি মির্জাপুরে কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। লোকমুখে শুনছি। এ নিয়ে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি।’
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, ‘শুনছি মেয়েটির বাড়ি মির্জাপুর উপজেলায়, তবে এখনও বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের কিছু জানায়নি।’