প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের পর গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। সেইসঙ্গে মহাসড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক রয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলেও ৫ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলেছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কারখানার আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান ছিল।
গ্রেফতার ৭০ জন
এদিকে, আন্দোলন ঘিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার ঘটনায় শিল্প পুলিশ ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) পক্ষ থেকে ১২টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ৭০ জন। তাদের পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করছে পুলিশ। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও আরও কয়েকটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
তবে আন্দোলনের সময় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে নিহত পোশাক শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও কোনও মামলা করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। তবে নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) আমজাদ হোসাইন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে এবং ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অপরদিকে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, জিএমপির বিভিন্ন থানায় ৯টি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৪২ জনকে। তাদের পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আরও কয়েকটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।’
গত শুক্রবার রাতে কোনাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তিন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কোনাবাড়ী থানা পুলিশ। তারা হলেন গাজীপুর মহানগরের ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রুবেল মিয়া, আওয়ামী লীগ কর্মী আজিজুল হক ও আমিনুল ইসলাম। কোনাবাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আসিফ ইকবাল গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শনিবার তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ১ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কোনাবাড়ীতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকরা ট্রাফিক পুলিশ ও শিল্প পুলিশ বক্সে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ ঘটনায় শিল্প পুলিশ ও জিএমপির পক্ষ থেকে কোনাবাড়ী থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়।
তৌফিকের মৃত্যুতে মামলা হয়নি
গত সোমবার বাংলাবাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের সময় একটি কারখানায় ভাঙচুরের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন ২১ বছর বয়সী শ্রমিক তৌফিক শেখ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় কয়েকজন তাকে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
তৌফিক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে এসে এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা ফ্যাশন গার্মেন্টসে চাকরি নেন। তিনি বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন বলেন, ‘তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়নি। তবে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে জিএমপি ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।’
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে গাজীপুরে অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ সময় তাদের ক্যামেরা ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক নেতারা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
অপরদিকে পোশাকশিল্পের কয়েকজন মালিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, গার্মেন্ট শ্রমিক গাজীপুর নামের ফেসবুক গ্রুপসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও গ্রুপ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শ্রমিকদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
নাশকতার অভিযোগে একাধিক মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটলেও শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও মামলা না হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।