কুষ্টিয়ার তাঁত শ্রমিকরা চরম দুর্দিনে রয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের অভাব ও নানা প্রতিকূলতার কারণে এক কালের প্রসিদ্ধ তাঁত শিল্প এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। ক্রমাগত লোকসান, প্রয়োজনীয় পুঁজি, সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব, চোরাই পথে আসা ভারতীয় কাপড়ের ছড়াছড়ি আর দফায় দফায় কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে চরম দুর্দিন চলছে তাঁত শ্রমিকদের।
কাপড়ের রং, কেমিক্যাল ও সুতার মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাঁতের তৈরি কাপড়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। মেশিনের তৈরি নানাবিধ পণ্যসামগ্রী বাজারে আসায় দেশিয় তৈরি কাপড়ের চাহিদা একেবারেই কমে গেছে। ফলে একরকম দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন এই পেশার সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরা।
জানা গেছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি টাকুর-টুকুর শব্দে মুখর হয়ে থাকত যে তাঁত পল্লীগুলো এখন আর সেখানে তাঁতের কর্মমুখরতা নেই। কালের বিবর্তনে সেখানে এখন নৈঃশব্দের আবাদ। মাঝে মাঝে কয়েকটি তাঁত কল চললেও আগের মতো আর তাদের তাঁতে সুর ওঠে না। ঠিক মতো সংসার চলে না। পেটের দায়ে পূর্বপুরুষের এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁতিরা।
সূত্র জানান, তাঁতশিল্পের নগরী খ্যাত কুষ্টিয়ার কুমারখালী, খোকসা ও মিরপুর উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি তাঁতি ছিলেন। হস্তচালিত তাঁত ৪৪ হাজার ও বিদ্যুৎ চালিত ১ হাজার। প্রতি বছর ২৬০ কোটি টাকা মূল্যের কাপড় তৈরি হত এই জেলায়। ২ কোটি ৮৮ লাখ পিস লুঙ্গি, ১৫ লাখ পিস বেডকভার, ৭২ লাখ পিস গামছা তোয়ালে উৎপাদিত হতো। এক সময় এই জেলায় বস্ত্রশিল্পের বার্ষিক আয় ছিল ৩শ'কোটি টাকারও ওপরে। দেশের মোট কাপড়ের চাহিদার ৬৩ ভাগ পূরণ করতেন কুষ্টিয়ার তাঁতিরা।
১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই তাঁত কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বর্তমানে এই চাহিদা কমে ৩৫ ভাগে নেমে এসেছে। সব কিছুর দাম বাড়লেও তাঁতবস্ত্রের দাম আশানুরূপ না বাড়ায় কুষ্টিয়ার ১ লাখ ১৪ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৫০ হাজার তাঁত শ্রমিক পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখনও পুরাতন পেশা হিসেবে এই পেশায় টিকে আছে কয়েক হাজার তাঁতি।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়ীয়া ইউনিয়নের কারিগর পাড়ার তাঁতি আব্দুল আজিজ জানান, বর্তমানে তাঁতের কাজ করে সংসার চলে না। সুতার দাম বেশি হওয়ায় এ কাজ করে আর লাভ হয় না। কারিগররাও আর এই কাজ করতে চায় না। পূর্ব পুরুষরা এই কাজ করে গেছেন। তাই কোনও মতে এই কাজটাকে ধরে রাখা।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের তো দেখার মতো কেউ নেই। সরকারি কোনও সাহায্য সহযোগিতা তো পাই না। শুনতে পাই অন্য এলাকার তাঁতিরা বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা পান। ব্যাংক তাদের ঋণ দেয়। কিন্তু আমাদের দেয় না কেন?
একই এলাকার তাঁত শ্রমিক নাসিমা খাতুন জানান, আমার পরিবারে উপার্জনক্ষম তেমন কেউ নেই। আমার স্বামীর পাশাপাশি আমাকে এই কাজ করতে হয়। এখন যে অবস্থা তাতে সেটিও সম্ভব হবে না বলে মনে হচ্ছে। এই এলাকার ৫০ঘর তাঁতি থাকলেও পর্যাপ্ত সুতার অভাবে কাজ বন্ধ রেখেছেন প্রায় ৩০ ঘর তাঁতি। কোনও মতে টিকে রয়েছে ২০ ঘর তাঁতি। তাঁতিদের এ দুর্দিনে এলাকার তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারি সাহায্য দরকার।
এই ব্যাপারে আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল বারী টুটুল জানান, বর্তমানে এই অঞ্চলের তাঁতিদের অতিকষ্টে দিন কাটছে। তাঁতিদের মধ্যে অনেকেই তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। তাদের এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন।
এই ব্যাপারে মিরপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি যে, বর্তমানে ওই অঞ্চলের তাঁতিদের দুর্দিন চলছে। তবে এই ব্যাপারে তাদের উন্নয়নের জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের কোনও সহযোগিতা করার সুযোগ নেই।
এই ব্যাপারে কুষ্টিয়া যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোরশেদ আলম জানান, যে সব তরুণ-তরুণী যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে শুধু মাত্র তাদেরই ঋণ দেওয়া হয়। তারা যদি এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁতের কাজ করে তাহলে আমরা তাদের ঋণ দিতে পারি।
তিনি আরও জানান,এই ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাদের সাহায্য সহযোগিতা করতে পারে।
আরও পড়ুন:
জমি ও পানি ব্যবস্থাপনা সংকট: হুমকির মুখে চিংড়ি রফতানি!
‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে র্যাব-পুলিশের প্রতিরোধ?
/জেবি/ এইচকে/