বেসামাল বাজার দর, বিপাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

খুলনার বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। চিনির দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। রমজান মাসের চেয়ে চিনির দাম এখন প্রায় দ্বিগুণ। মোটা চালের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও চিকন চালের দাম বেড়েছে। খোলা আটা, মসুর ডাল, আলু, বিভিন্ন প্রকারের সবজির দামও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুনের দামও বাড়তি। মাছের দাম যেন আকাশ ছোঁয়া। বাজার দরের এমন ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা পড়েছেন সংকটে। পণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতারা আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না।

খুলনা জেলা মৎস্য অফিসের সহকারী পরিচালক মণিষ কুমার মণ্ডল বলেন, পানি কম থাকায় ফাল্গুন-চৈত্র মাসে সেচ দিয়ে পুকুর, ডোবা-নালা, খাল-বিলে ব্যাপকহারে মাছ ধরা পড়ে। আর এখন চাষের মাছও বাজারে আসছে না। মাছগুলো ব্যবসায়ীরা মজুদ করছেন। বৈরী অবহাওয়ার কারণে সাগরেও ঠিক মতো মাছ ধরতে পারছে না জেলেরা।

তিনি বলেন, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মিষ্টি পানির দেশীয় মাছ খুলনায় আসতো। বর্তমানে দাম বেশি পাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা এই মাছ ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে খুলনার বাজারে মাছের সরবরাহ কম। বর্ষায় জলাশয়গুলোয় পানি বাড়তে শুরু করেছে। দেশীয় প্রজাতির মাছও ডিম ছাড়ছে। আর এক মাস পর দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বাজারে উঠতে শুরু করবে। তখন বাজারে মাছের সরবরাহ বাড়বে।

মহানগরীর বিভিন্ন বাজর ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়ে এখন ৪০ থেকে ৪৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম ২৪-২৬ টাকা। খোলা আটা ২৫-২৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিনির দাম সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে চিনি ৭০-৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ছিল ৫৬-৫৮ টাকা। মসুর ডাল ১৫০ টাকা, আলু ২৪-২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির মধ্যে বেগুন ৩০-৪০ টাকা, পটল ২০-২৪ টাকা, করল্লা ২৫-৩০ টাকা, কুশি ২৮-৩০ টাকা, ঝিঙে ২৫-৩০ টাকা, লাউ ২০-৩০ টাকা, পেপে ২০-২৫ টাকা, কচুরমুখী ২৫-৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া-২৫, বরবটি ২৮-৩২ টাকা, কচুরলতি ২০-২৫ টাকা, শশা ২৫-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দাম এক মাসে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকায় উঠেছে।

বৃষ্টি বাড়ারা সঙ্গে সঙ্গে সব সবজির দামও বাড়ছে। যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। প্রকার ভেদে মশলার দামও বেড়েছে। পেঁয়াজ এখন ২৪-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ভ্যানে ৫ কেজি পেঁয়াজ একসঙ্গে ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। রসুনের দাম ১০০-২২০ থেকে ১২০-২৪০ টাকা দাম উঠেছে। নতুন আদা ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজি প্রতি শুকনা মরিচ (দেশি) ১৯০, ভারতীয় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে খোলা বাজরে খুচরা দাম আগের মতই আছে। জিরা গত মাসে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি ছিল। এখনও একই দর রয়েছে। গরম মশলার দামও আগের মতোই। সয়াবিন তেল খোলা বাজারে ৭৬ টাকা কেজি, পাম অয়েল ৬৮ টাকা লিটার, পাঁচ লিটরের বোতলের সয়াবিন তেল ৪৪০-৪৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাইস ব্রান অয়েল ৫ লিটার ৪৮০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। সরিষার তেল খোলা বাজারে ১১০ টাকা কেজি।

মাছের মধ্যে দেশি রুই ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৮০-৩০০ টাকা হয়েছে। কাতলা ২২০-৩০০ টাকা, ইলিশ ছোট ৫০০ টাকা, মাঝারি ৭০০-১০০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাঙ্গাস ১০০-১৩০ টাকা, কৈ দেশি ৫০০-৬০০ টাকা, চাষের কই দেড়শ টাকা, টেংরা ৪০০-৫০০ টাকা কেজি দর রয়েছে। সামুদ্রিক মাছের দামও বেশ চড়া।

গরুর মাংস ৪০০-৪২০ টাকা, খাসীর মাংস ৫৮০-৬০০ টাকা, দেশি মুরগি ৩৪০-৩৫০ টাকা, পোল্ট্রি মুরগি ১৩০-১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির ডিম ৩৮-৪০ টাকা, ফার্মের মুরগির ডিম (লাল) ৩২-৩৩ টাকা, (সাদা) ৩১-৩২ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।

গোবরচাকার মুসা হোসেন বলেন, ‘নিউ মার্কেটে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই বেড়েছে। চিনির দাম শোনার পর তো মনেই হল বৈদ্যুতিক শক খেলাম। সব সবজিতেই ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। শাকের দামও কেজিতে ৫ টাকা হারে বাড়ানো হয়েছে।’

টুটপাড়া আসাফুর রহমান বলেন, আশপাশের এলাকায় চাষ করা সবজি টুটপাড়া বাজারে বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে অন্যান্য বাজারের চেয়ে এখানে কিছুটা হলেও দাম কম থাকে। তারপরও এখন এখানে সব ধরনের সবজিতে ৫টাকা হারে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।

খালিশপুরর চিত্রালী বাজারের ব্যবসায়ী ফরিদ আলম বলেন, পাইকারি বাজার থেকে কেনা দামের সঙ্গে সামান্য বৃদ্ধি করে খুচরা বিক্রি করা হয়। ইচ্ছামত দাম বাড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। দাম বেশি হলে ক্রেতারাও এখন প্রতিবাদ করেন। ফলে দাম নিয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। পাইকাররাই দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

বড় বাজারের পাইকারি বিক্রেতা আজগর হোসেন বলেন, আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে একটু দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ যথেষ্ট ভালো।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সদস্য সচিব কুদরত ই খুদা বলেন, সরকারের বাজার মনিটরিং না থাকা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ফলে বাজারে পণ্য মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। পণ্যের কোনও সংকট নেই। ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাভবান হচ্ছেন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির ফলে একচেটিয়া লাভ করার প্রবণতা বাড়ছে। এর প্রভাবে বাজার ক্রমেই অস্তিতিশীল হয়ে উঠছে। পাইকারি থেকে খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য ৩ গুণ। ফলে সমস্যা পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।

 আরও পড়ুন:

শিক্ষক সংকটে মেডিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা!

 শিবির ধরতে ইডেন কলেজ কর্তৃপক্ষের অভিযান, আটক ৫

/এসটি/