স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও শহীদদের পরিবারের খোঁজ রাখেনি কেউ। এখন তাদের দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেও বিচার পায়নি নিহতদের পরিবার। এমনকি শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যও সরকারিভাবে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
খুলনা শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভৈরব নদীর পাশ ঘেঁষে দিঘলিয়া উপজেলা। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ উপজেলার মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেয়াড়া গ্রাম ও এখানকার নিরীহ মানুষ। সেখানে বিহারীদের কলোনি থাকায় বাঙালিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হত।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও কোনও সরকারই গণহত্যায় শহীদদের এই গণকবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করে কি লাভ হলো?
তিনি জানান, ছোট একটি মুদি দোকান দিয়ে সংসার চালাতেন। পুঁজি শেষ হওয়ায় দোকানটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। আয়ের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় পরিবারের সদস্যদের অনাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটছে। বয়স্ক ভাতাটুকুও জোটেনি তার ভাগ্যে।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট ভোর রাতে সাবেক ছাত্রনেতা শেখ আব্দার রহমান তার দলবল নিয়ে উপজেলার দেয়াড়া নিজ গ্রামে অবস্থান করছিলেন। এ খবর পেয়ে কয়েকশ রাজাকার, বিহারি ও পাক-হানাদার বাহিনী তার বাড়িসহ গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে। ওই বাড়ি থেকে একই পরিবারের ছয় সদস্যকে ধরে নিয়ে যায় হানাদাররা। একই রাতে গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ৫৫ জনকে ধরে নিয়ে যায়। সকাল ৯টার দিকে দেয়াড়া বিহারি কলোনির পৃথক তিনটি স্থানে তাদের গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয়। রাজাকাররা ২২ জনের লাশ পৃথক তিনটি স্থানে গণকবর দেয়। বাকি লাশগুলো পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এ সময় লাশের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সৈয়দ আবুল বাসার ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। পরিবারে সদস্যরা লাশের স্তুপ থেকে তাকে তুলে নিয়ে আসে। আবুল বাসার ধারালো অস্ত্রের ১৯টি ক্ষত চিহ্ন নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন।
দেয়াড়ার এ গণহত্যার ঘটনায় খুলনা আদালতে ২০০৯ সালের ৩০ জুন রাজাকারদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যায় নিহত ইসমাঈল হোসেনের স্ত্রী রোকেয়া বেগম বাদী হয়ে ২১ রাজাকারের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এদের মধ্যে ১৯ জন ইতিমধ্যেই মারা গেছে। বাকি দুজন এখনও জীবিত। কিন্তু গত ৭ বছরেও মামলার কোনও সুরাহা হয়নি। বর্তমানে অসুস্থ রয়েছেন বাদী রোকেয়া বেগম।
মামলার বাদী রোকেয়া বেগমের মেয়ে শারমিন খাতুন রুনু বলেন, আমার মা বাদী হয়ে রাজাকারদের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করেছেন। এখনও বিচার পাইনি। মামলাটি পরিচালনা করতে গিয়ে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারেন না। অর্থাভাবে তার ন্যুনতম চিকিৎসা করানো কঠিন হচ্ছে।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও শহীদের গণকবর সংরক্ষণ ও তাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি স্থানীয়ভাবে স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন শিল্পপতি মুক্তিযোদ্ধা কাজী শাহ নেওয়াজ। তার নিজস্ব জমিতে থাকা একটি গণকবরের পাশে দ্বিতীয় গণকবরটি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ দিনটি পালন করা হয়।
/বিটি/