বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) সকালে যশোর উপশহরের মহিলা কলেজের পাশে সেক্টর নম্বর ২, বাড়ি নম্বর ৩৪ থেকে চেং হেসংয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি চীন থেকে ইজিবাইকের ব্যাটারি আমদানি করে এ অঞ্চলে ব্যবসা করতেন। এই খুনের ঘটনায় চীনা নাগরিকের দুই সহকারী নাজমুল হাসান পারভেজ (২৬) ও তার ভাইপো মুক্তাদির রহমানকে (২০) আটক করেছে পুলিশ।
ইজিবাইকের স্থানীয় ব্যবসায়ী লিকু জানান, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চেং হেসং মাঝেমধ্যে আসতেন। বেশ আমোদপ্রিয় এই মানুষটি সদালাপী ছিলেন। তাকে আপ্যায়নের বিষয়ে বললে তিনি নিজেই অন্যদের আপ্যায়ন করতেন।
লিকু বলেন, ‘চেং হেসং দু’একটি বাংলাভাষার ব্যবহার করতেন। তার মধ্যে সালাম দেওয়া, ভালো আছি, খেয়েছি ইত্যাদি বলতেন।’
চেং হেসং যশোরে একটি চীনা কোম্পানির ইঞ্জিনচালিত রিকশার ব্যাটারি, মোটর ইত্যাদির ব্যবসা করতেন। যশোর শহরতলীর উপশহর এলাকার মহিলা কলেজের পাশে ফরিদা ভিলা নামে একটি বাড়ির (সেক্টর নম্বর ২, বাড়ি নম্বর ৩৪) নিচতলায় তাদের গোডাউন ছিল। সেখানে নাজমুল থাকতেন।
বুধবার দুপুরে কোনও এক সময় তাকে খুন করা হয়েছে বলে জানান চেং হেসংয়ের ঢাকার বাসার ড্রাইভার ওয়ায়েশ কুরনী সুমন। তিনি দাবি করেন, নাজমুলের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হন। রাতে চেং চেসংয়ের মোবাইলফোনে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রী ও সুমন কয়েকদফা কথা বলেন নাজমুলের সঙ্গে। সেসময় নাজমুল তাদের জানান, চেংকে খুঁজে পাচ্ছেন না। তখন তাকে পুলিশের কাছে যেতে বলা হয়।
এরপর বুধবার রাত ১২টার দিকে নাজমুল কোতোয়ালি থানায় যান চেংয়ের নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করতে। তার কথাবার্তায় পুলিশের সন্দেহ হয় এবং তাকে আটক করা হয়।
যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানসহ পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার লোকজন বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের জানান, ’চেং হেসংকে নাজমুল ও তার ভাইপো মুক্তাদির লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে, গলায় ফাঁস দিয়ে এবং হাতের কয়েকটি স্থানে ব্লেড দিয়ে কেটে হত্যা করেছে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর তাকে গোডাউনের একটি টয়লেটে বস্তা ও মোটা কাগজ দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলে রাখে তারা। পরে পুলিশ তাদের দেওয়া তথ্য মতে মরদেহ সেখান থেকে উদ্ধার করে। লাশের মুখের ভেতর টিস্যুপেপার ভরা ছিল।’
যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুইজনকে আটক করে তদন্ত করছে। লাশের ময়নাতদন্ত এবং পুলিশের অনুসন্ধান শেষ হলেই এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের বিষয়টি জানা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘নিহতের স্ত্রী শোকাহত। পরে তার সঙ্গে কথা বলে মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি যেভাবে চান, সেভাবে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করা যায়- সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।’
প্রসঙ্গত, চীনা নাগরিক ব্যবসায়ী চেং হেসং ২০১৪ সাল থেকেই বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন। মাস সাতেক আগে তিনি উপশহর মহিলার কলেজের পাশে মাসুদুর রহমানের বাড়িটির নিচতলায় তার ব্যবসায়ী পণ্যের জন্যে গোডাউন হিসেবে ভাড়া নেন। এই গোডাউনে নাজমুল হাসান পারভেজ (২৬) তার ব্যবসায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করতো। নাজমুলের বাড়ি নেত্রকোণা জেলা সদরের চকপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম মুজিবুর রহমান।
পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, ব্যবসায়ের একটি মোটা অংকের টাকা সম্প্রতি কালেকশন করে নাজমুল। এসব বিষয়ে জানতে বুধবার দুপুরের দিকে গোডাউনে আসেন চেং হেসং। এই টাকা আত্মসাৎ এবং হিসাবের জটিলতা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই তাকে নাজমুল ও তার ভাইপো মুক্তাদির খুন করে লাশ টয়লেটের মধ্যে রাখে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর আগে চেং হেসংয়ের গাড়ি চালক মামুন দাবি করেন, গাড়ির বিল হিসেবে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় চাং হিং সংকে হত্যা করেছে নাজমুল ও মোক্তাদির।
কোতোয়ালি থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন জানান, তিনি ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন।
তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশে আসেন করেন ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর।
আরও পড়ুন-
নাসিকে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে তিন শ্রেণির ভোটার
/এফএস/