যশোরে চীনা নাগরিক চেং হেসং(৪৫) হত্যার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। যশোর উপশহর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইলিয়াস হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চীনা নাগরিক চেং হেসং হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে নেত্রকোনা জেলা সদরের চকপাড়া এলাকার নাজমুল হাসান পারভেজ ও মুক্তাদির রহমানকে।
ওসি মো. ইলিয়াস হোসেন সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আসামি দু’জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দী গ্রহণের কাজ চলছে।
প্রসঙ্গত, চীনা নাগরিক চেং হেসংয়ের বস্তাবন্দী মরদেহ পুলিশ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে যশোর উপশহর মহিলা কলেজের নিকটস্থ ২ নম্বর সেক্টরের ৩৪ নম্বর প্লটের তিন তলা ফরিদা ভিলার নীচতলা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
এই বাড়িটি ওই চীনা নাগরিকের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের গোডাউন হিসেবে ব্যববহৃত হতো।
বৃহস্পতিবার সকালে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনতলা বাড়িটির নীচতলায় চীনা নাগরিক চেং হেসংকে টাকার জন্যে তার সহকারী নাজমুল ও নাজমুলের ভাইপো মুক্তাদির লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে ও পরে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর তার মোবাইলফোন সেট নিজেদের কাছে রেখে বন্ধ করে দেয়।
তিনি জানান, নিহতের স্ত্রী ঢাকার উত্তরায় থাকেন। তিনি রাতে কয়েকদফা ফোন করে তাকে না পেয়ে নাজমুলকে ফোন দেন। তখন নাজমুল জানায়, স্যারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেইসময় তার স্ত্রী বিষয়টি থানায় জানাতে বলেন।
পুলিশ জানায়, গভীররাতে নাজমুল কোতোয়ালি থানায় এ বিষয়ে জানাতে গেলে পুলিশ তাকেই সন্দেহ করে আটক করে। পরে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মুক্তাদিরকে আটক করা হয়। তারা পুলিশের কাছে চীনা নাগরিককে খুনের বিষয়টির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথাটি স্বীকার করে।
চীনা নাগরিক চেং হেসং বছর দুই আগে যশোর শহরের ঘোপ জেল রোড এলাকায় ইঞ্জিনিয়ার জাহিদ হোসেনের তিনতলা বাড়িটির (২৪১/১) দ্বিতীয়তলা ভাড়া নেন। তখন তার স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন। পরে তিনি একাই থাকতেন এবং তার স্ত্রী মাঝেমধ্যে আসতেন- জানান বাড়ির মালিক জাহিদ হোসেনের ভাইপো ফয়সাল হোসেন।
তিনি জানান, চেং হেসং খুবই মিশুক ছিলেন। তিনি বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষা তেমন একটা বুঝতেন না। তবে, সদালাপী এবং বন্ধুবৎসল ছিলেন। আশপাশের কারও সঙ্গে তেমন একটা মিশতেন না।
ইজিবাইকের স্থানীয় ব্যবসায়ী লিকু জানান, তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে চেং হেসং মাঝেমধ্যে আসতেন। বেশ আমোদপ্রিয় এই মানুষটি সদালাপী ছিলেন। তাকে আপ্যায়নের বিষয়ে বললে তিনি নিজেই অন্যদের আপ্যায়িত করতেন।
লিকু জানান, দু’একটি বাংলাভাষার ব্যবহার করতেন। তার মধ্যে সালাম দেওয়া, ভাল আছি, খেয়েছি ইত্যাদি।
চেং হেসং যশোরে একটি চীনা কোম্পানির ইঞ্জিনচালিত রিকশার ব্যাটারি, মোটর ইত্যাদির ব্যবসা করতেন।
বুধবার দুপুরে কোনও এক সময় তাকে খুন করা হয়েছে বলে জানান চেং হেসংয়ের ঢাকাস্থ বাসার ড্রাইভার ওয়ায়েশ কুরনী সুমন।
তিনি দাবি করেন, নাজমুলের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি তিনি নিশ্চিত হন।
পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, ব্যবসায়ের একটি মোটা অংকের টাকা সম্প্রতি কালেকশন করেন নাজমুল। এসব বিষয়ে জানতে বুধবার দুপুরের দিকে গোডাউনে আসেন চেং হেসং। টাকা আত্মসাৎ এবং হিসাবে জটিলতা নিয়েই দ্বন্দ্বের কারণেই তাকে নাজমুল ও তার ভাইপো মুক্তাদির খুন করে লাশ টয়লেটের মধ্যে রাখে।
যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, নিহতের স্ত্রী শোকাহত। পরে তার সঙ্গে কথা বলে মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি যেভাবে চান, সেভাবে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করা যায়- সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
প্রসঙ্গত, চীনা নাগরিক ব্যবসায়ী চেং হেসং ২০১৪ সাল থেকেই বাংলাদেশে ইজিবাইকের ব্যাটারি, মোটর ইত্যাদির ব্যবসা করতেন। মাস সাতেক আগে তিনি উপশহর মহিলার কলেজের পাশে মাসুদুর রহমানের বাড়িটির নিচতলায় তার ব্যবসায়ী পণ্যের জন্যে গোডাউন হিসেবে ভাড়া নেন। এই গোডাউনে নাজমুল হাসান পারভেজ (২৬) তার ব্যবসায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করতো।
চেং ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
/এইচকে/