মাগুরায় ঝুঁকি নিয়েই পরিত্যক্ত ভবনে চলছে পাঠদান





মাগুরায় পরিত্যক্ত ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছেমাগুরা শহরের ভায়নার মোড়ে আছিয়া খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চলছে ১৭০ শিশুর পাঠদান। যেকোনও সময় ভবনটি ভেঙে পড়তে পারে এমন অবস্থা জানার পরেও প্রতিনিয়ত চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।





ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আতঙ্কের মাঝেই শিশুদের ক্লাস করাতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা। নতুন ভবন তৈরি বা মেরামতের জন্য কয়েক দফা চিঠি চালাচালির পরেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, যেকোনও সময় ঘটে যেতে পারে রানাপ্লাজার মতো দুর্ঘটনা। আরও একটি রানাপ্লাজা ট্রাজেডি যেন না হয়, তাই শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান শিক্ষক, এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা।
Magura-Primary-School-Problem-Pic-2সরেজমিনে স্কুলটিতে গিয়ে ভূক্তভোগী শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-যশোর মহাসড়কের পাশে নির্মিত স্কুল ভবনটিতে ১৭০ ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করে। ১৯৯৪ সালে সরকারের ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টের আওতায় এই বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি তৈরি করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে ছাদের আরসিসি পিলারের ক্ষয়ে যাওয়া জায়গাগুলো সামান্য প্লাস্টারের মাধ্যমে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তাতেও কোনও লাভ হয়নি। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ইতোমধ্যে প্রত্যেকটি শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে রড বের হয়ে গেছে। অনেক জায়গাতে ফাটলও দেখা দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়তে থাকে। বৈদ্যুতিক ফ্যানের ভেতরে পানি ঢুকে ইতিমধ্যে আটটি ফ্যান পুড়ে গেছে। এ কারণে ফ্যান ছাড়াই শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার শুরু থেকেই স্কুল মাঠটি পানি ও কাঁদায় পরিপূর্ণ থাকে। বেশি বৃষ্টি হলে পানি মাঠ ছেড়ে ক্লাসরুমে ও লাইব্রেরি রুমে ঢুকে পড়ে।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া, মুন্নি খাতুন ও মায়া খাতুন, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হৃদয় হোসেন জানায়, যেকোনও সময় ছাদ থেকে পলেস্তরা খসে আহত হওয়ার ভয় নিয়েই ক্লাস করতে হয়। আতঙ্কে ক্লাসে মনোযোগ নষ্ট হয়। ফ্যান না চলায় গরমেও প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ থেকে টিপটিপ করে পানি পড়ে ক্লাসরুমে পানি জমে যায়।
Magura-Primary-School-Problem-Picশিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুরো বর্ষাকাল জুড়ে স্কুলমাঠ পানি-কাদায় ভরে থাকে। খেলাধুলার কোনও জায়গা না থাকায় তাদের সারাক্ষণ ক্লাসরুমের মধ্যেই কাটাতে হয়। এজন্য অনেকেই স্কুলে ঠিকমতো আসে না।
অভিভাবক রিপন হোসেন, নান্নু মিয়া, নিজাম মিয়া, আশরাফুল ইসলাম, আঙ্গুর বেগম, হালিমা খাতুন জানান, স্কুল ভবনটির অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে তারা সব সময়ই ভয় ও দুঃশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন। দ্রুত নতুন স্কুল ভবন তৈরির দাবিও জানান তারা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালী রানী বিশ্বাস বলেন, ‘ভবনের চারটি রুমের সব ক’টিতেই ছাদের পলেস্তরা ও ইটের খোয়া খসে পড়েছে। যেকোনও সময় পুরো ভবনটি ধসে ১৭০ জন ছাত্রছাত্রী ও ছয়জন শিক্ষকের প্রাণহানি ঘটতে পারে। বেশ কয়েক বছর ধরে এ সমস্যা নিয়ে বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনও ফল পাওয়া যায়নি। স্কুল ভবনের যে অবস্থা, তাতে যেকোনও সময় আমরা রানাপ্লাজার মত ভায়বহ আরেকটি দুর্ঘটনার শিকার হতে পারি।’
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘স্কুলের মাঠের পানি বের করে দেওয়ার জন্য পৌরসভার মেয়রকে জানানো হলেও জমে থাকা পানি বের করার কোনও ব্যবস্থা করেননি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠটি ডুবে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের লেখা পড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা খেলাধুলাও করতে পারছে না।’
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলম বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিদ্যালয়টি ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা ঝুঁকি নিয়েই এখানে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই স্কুলসহ অতি জরুরি ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের জন্য ১০টি স্কুলের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
এ ব্যাপারে এলজিইডির মাগুরা সদর উপজেলা প্রকৌশলী আনন্দ কুমার ঘোষ বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস নেওয়া অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনকে ঝুঁকিমুক্ত না করে ক্লাসে ছাত্রদের লেখাপড়া করানো মোটেই ঠিক হচ্ছে না। আমরা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
/এআর/এসএমএ/