সুন্দরবনের আগুন দস্যুতা

এক বছরেও হয়নি কাঁটাতারের বেড়া ও ওয়াচ টাওয়ারের নির্মাণ কাজ

78b80d90360d7917798f0d98ff0bcb37-5721e6c533597পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষাসহ আগুন দস্যুতা ঠেকাতে বন সন্নিহিত লোকালয় জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ কাজ এক বছরেও শুরু হয়নি। একই সঙ্গে সুন্দরবনের এই দুটি রেঞ্জের ভরাট হয়ে যাওয়া খালসহ ছোট-বড় ৩৫টি বিলে একাধিক পুকুর খননেরও কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।


গত বছরে মাত্র এক মাসের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের গহীন অরণ্য নাশকতার আগুনে পুড়ে ছাই হওয়ার পর পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুস আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরপরই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিদের্শ দিলেও আজও ওইসব প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় জরুরি এসব প্রকল্প এখনও ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে । সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বাগেরহাটের শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ ও মংলা উপজেলার বন সন্নিহিত এলাকায় কাঁটা তারের বেড়াসহ ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ ও ৩৫ বিলে একাধিক পুকুর খনন প্রকল্প এক বছরেও অনুমোদন পায়নি। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ও তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশিত এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল- চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারীর লোকালয় থেকে থেকে শুরু করে কাটাখালী- বরুইতলা- জিউধরা- আমুরবুনিয়া- গুলিশাখালী- কলমতেজী ও ধানসাগর স্টেশন থেকে নাংলী টহল ফাঁড়ি পর্যন্ত ওয়াচ টাওয়ারসহ কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ। একই সঙ্গে চাঁদপাই রেঞ্জের পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দিয়ে অবৈধ উপায়ে মিঠা পানির মাছ চাষ করা চিরতরে বন্ধে ছোট-বড় ২৩টি বিলের প্রতিটিতে এক বা একাধিক পুকুর খনন, খনন করা পুকুরের মাটি দিয়ে অবশিষ্ট বিল ভরাট করে সেখানে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন যাতে করে বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণীর চাহিদা মেটাবে খননকৃত ওইসব পুকুরের মিঠা পানি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি সেই সময় প্রকল্প প্রস্তাব আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।পরবর্তীতে নিজস্ব উদ্যেগে অস্থায়ী ভিত্তিতে বাঁশ দিয়ে কিছু ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল এছাড়া কিছু খাল খনন করা হয়, যেগুলো দিয়ে জোয়ার ভাটার পানি ওঠানামা করছে। ফলে যারা এসব এলাকায় মাছ চাষ করতো তা মোটামুটি বন্ধ হয়ে গেছে।’
জানা গেছে, গত বছরের ২৭ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিলের পর্যন্ত মাত্র এক মাসে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনভুক্ত নাংলির পচাকোড়ালিয়া, টেংরা ও তুলাতলা বিলের মিঠা পানির মাছ আহরণ ও জাল পাতার স্থান পরিষ্কার করতে দুর্বৃত্তরা গহীন বনে চার দফায় পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়।
২০০২ সালের ২২ মার্চ ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড কটকা অভয়ারণ্যের প্রায় ১৫দিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুনের মধ্য দিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় বনে শুরু হয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এরপর সুন্দরবনে গত ১৪ বছরে ২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরিকল্পিতভাবে এসব আগুন লাগানোর সঙ্গে জড়িত আপরাধীরা সব সময় থেকে যায় ধরাছোয়ার বাইরে।
আরও জানা গেছে, ৯০ এর দশকের শুরুতে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জে উপজেলার বন সন্নিহিত লোকালয়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভোলা নদী ও শাখা খালসমূহ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সুন্দরবন অংশে পলি পড়ে উঁচু হয়ে যায়। এ কারণে চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে বন মরে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ছোট-বড় ৩৫টি বিলের সৃস্টি হয়। এরপর থেকে ওইসব বিল মিঠা পানি প্রজাতীর মাছের ভাণ্ডারে পরিণত হয়। সুন্দরবনের বিলে বৈধভাবে মিঠা পানির মাছ চাষ করে তা আহরণের কোনও সুযোগ না থাকায় প্রভাবশালী ৫/৬টি গ্রুপ সুন্দরবনের অসাধু কর্মকর্তাদের লাখ-লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এসব বিল অবৈধ উপায়ে দখলে নিয়ে উচ্চ মূল্যে তা আবার মৎস্য আড়ৎদার ও জেলেদের কাছে বিক্রি করে থাকে। আর এসব বিল পরিষ্কার করে মাছ আহরণ করতেই দস্যুরা সুন্দরবনে আগুন ধরিয়ে থাকে।
সুন্দরবনের এসব বিলের মধ্যে শুধু চাঁদপাই রেঞ্জেই ছোট-বড় ২৩টি মিঠা পানির মাছের বিল রয়েছে। অন্য ১২টি বিল রয়েছে শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায়।
এসব বিলের মধ্যে অবৈধ উপায়ে মাছ আহরণকারীদের নাশকতার আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে একমাত্র বাদুরতলা বিলটি। বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় বন সন্নিহিত এলাকার প্রভাবশালীরা এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে কথিত ইজারার নামে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোরা রেঞ্জের ৩৫টি বিলের কৈ, শিং, মাগুর, কানমাগুর, ফলইসহ বিভিন্ন প্রজাতি মিঠা পানির মাছ চাষ ও আহরণ করে থাকে। এজন্য শুকনা মৌসুমে মাছের বিল ও জাল পাতার স্থান পরিষ্কার করতে পরিকল্পিতভাবে সুন্দরবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
/এআর/