যশোর রোডের ১৫০ বছরের পুরনো বৃক্ষসহ প্রায় ২ হাজার ৭০০টি গাছ এখন হুমকির মুখে। যশোর-বেনাপোল সড়ক প্রশস্তকরণে এগুলো কেটে ফেলতে হবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। তবে গাছ রেখে রাস্তা প্রশস্তকরণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা। একই অভিমত যশোর জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষেরও।
যদিও বৃক্ষগুলো রেখেই সড়ক প্রশস্তকরণের দাবি জানিয়ে কবি ফখরে আলম বলেন, ‘১৮৪০ সালে জমিদার কালি পোদ্দার বাবু তার মায়ের গঙ্গাস্নানের জন্য যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত সড়কটি নির্মাণ করেন। আর মায়ের নির্দেশ অনুযায়ী পথচারীদের সুবিধার জন্য রাস্তার দুই পাশে রোপণ করেন অসংখ্য গাছ। অথচ সড়কটি প্রশস্তকরণ ও সংস্কার করতে শতবর্ষী গাছগুলো কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি মোটেও ঠিক হবে না।’
যশোর-বেনাপোল সড়কের শতবর্ষী গাছগুলো মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাসের সাক্ষী জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম বলেন, ‘১৯৭১ সালে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু শরণার্থী হয়েছিলেন এই সড়ক দিয়েই। মিত্রবাহিনীও এসেছিলেন এই পথ ধরেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘গাছগুলো রেখেই সড়ক প্রশস্ত করা যেতে পারে। বেনাপোলের ওপাশেও গাছগুলো রেখে পাশ দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের এখানেও তা সম্ভব।’
গাছ কেটে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাইবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘একসঙ্গে এত গাছ কেটে ফেলা ঠিক হবে না। এতে বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাবে; অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেবে। আর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে তা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবেলায় গাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই গাছগুলো না কেটে কীভাবে উন্নয়ন কাজ করা যায়, তা ভেবে দেখা দরকার।’
সওজ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে হাজার হাজার টন মালামাল পরিবহন হয়। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এটি এখন জরাজীর্ণ। এ কারণে এটি পুনর্নির্মাণের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ৭ দশমিক ৩ মিটার মূল পেভমেন্ট এবং দু’পাশে দেড় মিটার করে হার্ডশোল্ডার রেখে মহাসড়কটি সংস্কারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের উভয় পাশের প্রায় ২৭০০ গাছ কাটতে হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গাছের মালিকানা নিয়ে একটু জটিলতা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানিয়েছেন। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভার মাধ্যমে গাছের মালিকানা নির্ধারণ হবে। মালিকানা নির্ধারণের পরই গাছ কেটে সড়ক সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সওজ যশোর কর্তৃপক্ষ এ দুটি মহাসড়কের গাছ নিজের দাবি করে তা কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জেলা পরিষদের সিনিয়র প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগের ২০০৩ সালের ১২ মে প্রজ্ঞাপনে রাস্তার মালিকানা জেলা পরিষদের কাছ থেকে প্রত্যাহার করে অন্য কোনও সংস্থার কাছে দেওয়া হয়নি। এ কারণে অন্য কোনও সংস্থা রাস্তার জমির মালিকানা দাবি করতে পারবে না।’
যশোর জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল জানান, যশোর-বেনাপোল, যশোর-খুলনা, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের জমি যশোর জেলা পরিষদের মালিকানাধীন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে সড়কের যাবতীয় উন্নয়ন কাজ, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব জেলা পরিষদ পালন করে আসছে।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। উন্নয়নও করতে হবে, আবার গাছও রক্ষা করতে হবে। রাস্তার দুই পাশের গাছ কেটে মহাসড়ক সম্প্রসারণ করা ঠিক হবে না। উন্নয়নের স্বার্থে যদি গাছ কাটাই লাগে, তাহলে একপাশের গাছ কেটে অন্য পাশেরগুলো রাখা হোক। কারণ এগুলো অনেক পুরনো গাছ, আমাদের ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে এর সঙ্গে।’
/এআর/জেএইচ/