টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোলাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এসব এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ও বাসা-বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়াও উপজেলাগুলোর নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গো-খাদ্যের চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। লোকজনও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় অনেকে স্থানীয় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। এসব এলাকার সংযোগ সড়কসহ প্রধান সড়কগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ: সিলেটের ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জে উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। উপজেলার প্রায় ৫ শতাধিক গ্রামের দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পানিবন্দি পরিবারগুলো সরকারি ও বেসরকারি কোনো ধরনের ত্রাণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানিবন্দি লোকজনের অভিযোগ, এলাকার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা শুধু বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন আর ফটোশেসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন এবং ত্রাণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কুশিয়ারা ডাইকে ভাঙন, টানা বৃষ্টিপাত, কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধির কারণে দুটি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মানুষের বসতঘর, রাস্তাঘাট মুহূর্তেই তলিয়ে গেছে এবং প্রতি নিয়ত নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ সিংহ বলেন,‘পানিবন্দি হয়ে লোকজন দুর্ভোগে পড়েছে। বন্যার্তদের জন্য ৫ টন চাল বরাদ্দ এসেছে। বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদাল মিয়া বলেন, ‘বন্যার কারণে হাজার হাজার পরিবার চরম দুর্ভোগে আছে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার দুই তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ উপজেলার কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদ সীমার ১শ’ ৪১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরইমধ্যে দুটি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও উপজেলার সদরের সড়কে চলছে নৌকা।
বিয়ানীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নদীর পানি কমলেও লোকালয়ে এবং বিল হাওরে পানি বাড়ছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিয়ানীবাজার পৌরসভার কিছু এলাকা। সাধারণ মানুষ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করছেন নৌকা দিয়ে। এদিকে বন্যাকবলিত অন্য ৭টি ইউনিয়নেও পানি বেড়েছে। উপজেলার দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাথিউরা, তিলপাড়া, লাউতা, মুড়িয়া ও বিয়ানীবাজার পৌরসভার প্রায় ৭০ ভাগ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব ইউনিয়নের রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। বাসা-বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় মানুষজন আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। বাজারেও বন্যার প্রভাব পড়েছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান বলেন-‘কুশিয়ারার পানি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোয় সরকারের দেওয়া ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে। এছাড়াও অনেক প্রবাসী ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারী বাজার ও বাদেপাশাসহ শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের প্রায় শতাধীক গ্রামে কুশিয়ারা নদী ও হাকালুকি হাওরের পানি প্রবেশ করেছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উপজেলার কালিকৃষ্ণপুর, ইসলামপুর, রাংজিয়ল, নুরজাহানপুর, মেহেরপুর, কাদিপুর, পনাইরচক, খাটকাই,কদুপুর, বসন্তপুর, রামপুর, বাদেপাশা ইউনিয়নের আমকোনা, খাগাইল, নোয়াই মুল্লারচক।
স্থানীয়রা জানান, কালিজুরী ফুটবল মাঠ সংলগ্ন অপরিকল্পিত সুইচ গেইটের কারণে প্রতি বছর গ্রামের অর্ধেকাংশে বন্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় তিন থেকে চারশ পরিবারকে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাহাড়ের নীচে বসবাসকারীদের কয়েকদিন সরে থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। বন্যা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পানিবাহিত রোগে কেউ আক্রান্ত হলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জকিগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাখরশাল কুশিয়ারা ডাইকে ভাঙ্গনের কারণে উপজেলার বারহাল, বীরশ্রী, কসকনকপুর, খলাছড়া, মানিকপুরসহ সবকয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে।
বিয়ানীবজার উপজেলার শেওলা, দুবাগ, মুড়িয়া, মাথিউরা, তিলপাড়া, কুড়ারবাজার, মুড়িয়া ও লাউতা, মাইজকাপন, ইনামপুর, বড়উধাসহ নিম্নাঞ্চল এরই মধ্যে তলিয়ে গেছে। চারখাই ইউনিয়নের নওয়াগ্রাম ডাইক ভেঙে সুরমা নদীর পানি ঢুকেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় মেম্বারদেরকে সর্তক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে একাধিক কমিটি গঠিত হয়েছে।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন: নরসিংদীতে আড়াই লাখের বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন