খুমেক হাসপাতালে আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা!

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালরোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম, প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেওয়া, সার্টিফিকেট বাণিজ্য, বহির্বিভাগে দালাল চক্রের দাপট, রোগীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায়সহ নানা অনিয়ম ও  দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদের ‘তাৎক্ষণিক অ্যাকশনের’ ফলে রোগীরা সুফল পেতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। খুমেকের দুর্নীতিবাজরা আতঙ্কে রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুমেক হাসপাতালের রোগীরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ৮ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক ডা.এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ হাসপাতালের গাইনি ও লেবার ওয়ার্ড আকস্মিক পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি রোগীদের সকালের নাস্তায় অনিয়ম দেখতে পান। একই সঙ্গে ডেলিভারি রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টিও ধরা পড়ে। অর্থ নেওয়ার অভিযোগে ওই সময় তিনি দুই কর্মচারীকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করেন। এর আগে গত ৩ জুলাই সাড়ে ৭ কেজি ডালের স্থলে দুই কেজি ডাল রান্না এবং মাছের পরিবর্তে ডিম দেওয়ার বিষয়টিও তার নজরে আসে। এরপর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

২১ জুলাই  রাতে তিনি আবারও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পরিদর্শনে যান এবং বিভিন্ন অনিয়ম পান। রোগীদের কাছ থেকে সেলাই ও বিভিন্ন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ওয়ার্ড বয়ের অর্থ গ্রহণ,জরুরি বিভাগে রোগীদের জন্য সেলাইয়ের সুতা সাপ্লাই থাকার পরও বাইরে থেকে রোগীদের দিয়ে তা কিনতে বাধ্য করা ও পরে সেসব সুতা বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করাসহ বিভন্ন অনিয়ম তার নজরে আসে।২২ জুলাই হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে রোগীদের কাছ থেকে টেস্টের টাকা বিনা ভাউচারে নেওয়ার বিষয়টিও তার নজরে পড়ে।

রোগীরা জানান,একের পর এক হাসপাতালের অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়ায় হাসপাতালে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। ফলে রোগীরা সুফল পেতে শুরু করেছেন।

নাজমা বেগম নামের এক রোগী জানান, ‘সকালে নাস্তা হিসেবে বর্তমানে ৮পিস রুটি, একটি ডিম ও একটি কলা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দুপুরের খাবার হিসেবে মুরগির মাংস, ডাল ও ভাত দেওয়া হচ্ছে। এর আগে ৪ পিস রুটি দেওয়া হতো ও অনেক রোগীকে ডিম দেওয়া হতো না।’

গাইনী ওয়ার্ডের রোগী সাফিয়া বেগম জানান, ‘ভর্তি হওয়ার পর থেকে হাসপাতাল থেকেই সব ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে ভর্তি হওয়া রোগীরা এসব ওষুধ পেতো না। এছাড়া দুপুরের খাবারে মাংসের পরিমাণ আগের চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে এবং ভালো মানের ডাল ও ভাত দেওয়া হচ্ছে।’

সার্জারি ইউনিট-১ এর ৯-১০ ওয়ার্ডের রোগী প্রমানন্দন হাওলাদার (৬০) বলেন, ’২১ জুলাই তিনি এখানে ভর্তি হন। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে দুইটি টেস্ট করতে দেন।২২ জুলাই দুইটি টেস্টের জন্য তার ছেলে সন্তোষ মৃধা রক্ত নিয়ে প্যাথলজি বিভাগে যায়। সেখানে ২১০ টাকা নেওয়া হলেও তাকে কোনও ভাউচার স্লিপ দেওয়া হয়নি। দুপুরে রিপোর্ট নিয়ে সন্তোষ প্যাথলজি বিভাগ থেকে বের হওয়ার সময় তত্ত্বাবধায়ক তাকে দাঁড়াতে বলেন। সেসময় তত্ত্বাবধায়ক তার কাছে ভাউচার দেখতে চাইলে প্যাথলজি বিভাগ থেকে কোনও ভাউচার দেয়নি বলে তত্ত্বাবধায়ককে অবহিত করে তিনি।’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিজেই হাজির হয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিষয় অনিয়ম পাওয়ার পর সেখান থেকে দায়িত্বরতদের সরিয়ে আনা হয়েছে। রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে দুই কর্মচারীকে শোকজ করা হয়েছে। খাবারের অনিয়ম পাওয়ায় রান্না ঘরের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ অনিয়ম বন্ধে হাসপাতালের রান্না ঘরসহ গুরুত্বপুর্ণ স্থান সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে রোগীর টেস্টের জন্য নেওয়া টাকা বিনা রশিদে প্যাথলজি বিভাগ থেকে গ্রহণ করা হয়। এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া জরুরি বিভাগে অনিয়মের বিষয়ে আরও অনুসন্ধান করে জড়িতদের চিহ্নিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সার্টিফিকেট বাণিজ্য বন্ধে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

এ বিষয়ে খুলনা জেলার সিভিল সার্জন এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘খুলনা মেডিক্যাল কলেজের তত্ত্বাবধায়ক অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা খুবই প্রয়োজন ছিল। দায়িত্ব পালনের শুরুতেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে উনার কাজ সহজ হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খুমেক আমার আওতাভুক্ত নয়। তবুও উনি যদি আমার সহযোগিতা চান, আমি তা দিতে প্রস্তুত আছি।’

/এসএসএ/এনআই/এসটি/