ছয়টি চ্যলেঞ্জ হচ্ছে- ৮৩টি নদী ও খাল খনন এবং টাইডাল বেসিন দ্রুত বাস্তবায়ন, চ্যানেলে পলি জমার হার কমাতে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করা, রামপাল এবং মংলার তিন শতাধিক খালের বাঁধ, নেট-পাটা দ্রুত অপসারণ, ড্রেজিং করা মাটি অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সঙ্কট, চ্যানেলের মংলা অংশের জায়খা থেকে মংলা পর্যন্ত ড্রেজিং করা মাটি অপসারণ করা, সংরক্ষণ ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেওয়া। এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা না করলে এই চ্যানেলটি রক্ষ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।।
বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী আ. রব মণ্ডল বলেন, ‘খননের পর চ্যানেলটি সচল করা সম্ভব হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে সচল রাখতে হলে চ্যালেঞ্জগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চ্যানেলটির ৮৩টি শাখা খাল ও শাখানদী খননের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনও খনন কাজ শুরু হয়নি। অবৈধ চিংড়ি চাষিদের দখলে থাকা রামপাল-মংলার তিন শতাধিক শাখা খালের ১২ শতাধিক বাঁধ ছিল। গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) রামপাল ও মংলা দুই উপজেলাতে ৯শ’ টন চাল বরাদ্দ দিয়ে খালগুলো দখল মুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ীভাবে মনিটরিং না করার কারণে ওইসব খালে ফের বাঁধ দিয়ে চিংড়ি চাষ অব্যাহত রেখেছেন প্রভাবশালীরা। এদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও ফৌজদারি মামলা করার পরও কৌশলে তারা আবারও খাল দখল করে। গত দুই বছর ধরে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল খনন করে সচল করা হয়। কিন্তু শাখানদী, খালের বাঁধ ও নেট-পাটা মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে আবারও হুমকির মুখে পড়ছে খনন করা এ চ্যানেলটি। খনন কাজে ইতোমধ্যেই সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, চ্যানেলটি টিকিয়ে রাখতে সংরক্ষণ ড্রেজিং অব্যাহত রয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পর সংরক্ষণ ড্রেজিং করা হচ্ছে। কিন্তু শাখানদী ও খালগুলো বাঁধ দিয়ে আটকে রাখায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা। চ্যানেলের দাউদখালী নদীর ফয়লাহাট এলাকায় জৌখালী স্লুইস গেটটি আজও অপসারণ করা হয়নি। জৌখালীতে নদীর ওপরের অংশে নেট পাটা ও বাঁধ রয়েছে বেশি।
বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ জানায়, খননের পর ২০১৫ সালের ৬ মে নৌযান চলাচলের জন্য চ্যানেলটি খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে নৌবাহিনীর মাধ্যমে দু’টি প্রকল্পের আওতায় ছয়টি ও বিআইডব্লিউটিএ’র একটি ড্রেজার দিয়ে সংরক্ষণ, প্রশস্ত করা, এবং খনন কাজ চলছে। গত ২২ মে পর্যন্ত এ চ্যানেল দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার নৌযান চলাচল করেছে। জোয়ারের সময় ১৮ থেকে ২২ ফুট এবং ভাটার সময় ১০ থেকে ১৪ ফুট গভীরতা থাকে।
পরিবেশ সুরক্ষায় উপকূলীয় জোটের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাহ নেওয়াজ আলী বলেন, ‘চ্যানেল সচল রাখতে কিছু সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে চ্যানেলটি স্থায়ীভাবে সচল থাকবে। মংলা-জয়খা অংশে উচ্চহারে পলি পড়ছে। ড্রেজিং কাজ চললেও মাটি ফেলার জায়গার অভাব রয়েছে। এর ফলে মংলার বেপজার এরিয়ার ভেতর বাঁধ নির্মাণ করে পলি অপসারণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক এম এ সবুর রানা অবৈধ বাঁধের কারণে চ্যানেলটির নাব্যতা ঠিক রাখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মংলা-ঘষিয়াখালী নৌরুট খনন করার পর সচল হয়েছে। এখন চ্যানেলটি রক্ষার জন্য প্রয়োজন সব সংযোগ খালের বাঁধ অপসারণ। কিন্তু রামপালে ১৮শ’ বাঁধ অপসারণের কথা সরকারিভাবে বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বেশির ভাগ খালের বাঁধ এখনও অপসারণ করা হয়নি। কিছু এলাকার বাঁধ কাটার পর প্রভাবশালীরা আবারও পাটা দিয়ে আটকে রেখেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালে ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মংলা-ঘষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌপথ চালু করা হয়। পলি পড়ে ২২ কিলোমিটার বন্ধ হওয়ার কারণে ২০১০ সালের পর চ্যানেলটি পুরো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সুন্দরবনের ভেতর শ্যালা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল করতে থাকে। ২০১৪ সালে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবির পর এই চ্যানেলটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দু’বছর খননের পর এই চ্যানেলটি দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচলের উপযোগী হয়। চ্যানেলটি চালু হওয়ার ফলে ৮১ কিলোমিটার দূরুত্ব কমেছে। এছাড়া মংলা-ঘষিয়াখালীর রমজানপুর এলাকায় একটি লুপকাট করায় আরও ৫ কিলোমিটার দূরুত্ব কমেছে। বিআইডব্লিউটিএ’র নবনির্মিত আটটিসহ ১২টি ড্রেজার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছয়টি ড্রেজার দিয়ে ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি ফের খনন শুরু হয়। এরপর ২০১৫ সালের মে মাস থেকে চ্যানেলটিতে পরীক্ষামূলক যানবাহন চলাচল শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন গভীরতার ৩৫ হাজার ১৫টি জাহাজ এ চ্যানেলটি দিয়ে চলাচল করে। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যানেলটি উন্মুক্তকরণ ও ড্রেজার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
/এসএমএ/এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
ধর্ষণের পর নির্যাতিতা ও তার মাকে ন্যাড়া: নারী কাউন্সিলরকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ