হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষিত: রাজাকারের নামে একাডেমি, সড়ক ও মার্কেট





মেহেরপুরমেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম মুছে ফেলতে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে শিক্ষাসচিব ও স্থানীয় সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের সেই আদেশ মেহেরপুরে এখনও উপেক্ষিত। আদেশের এক বছরেও মেহেরপুরের মুজিবনগর এলাকার রাজাকার মিয়া মনসুর আলীর নামে একাডেমি, পৌর এলাকার রাজাকার সবদার আলীর নামে রাস্তা ও মার্কেটের এপিটাফে তাদের নাম এখনও রয়ে গেছে।

১৯৬৮ সালে মেহেরপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান। বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের প্রকৌশলীর দফতরে এখনও শ্বেতপাথরে উদ্বোধনের ‘এপিটাফ’-এ জ্বলজ্বল করছে মোনেম খানের নাম।

মেহেরপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আজিজ বলেন, ‘আদালতের নির্দেশটি অবগত নই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনও আদেশও পাইনি। আমিও ফলকটি তুলে ফেলার দাবি জানাই।’

১৯৭১ সালে তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন সবদার আলী মাস্টার। যদিও এলাকার শিক্ষার ক্ষেত্রে তাকে মডেল হিসেবে মনে করে দলমত নির্বিশেষে এখানকার অধিকাংশ মানুষ। পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নাম এবং একটি মার্কেটের নাম সাবদার আলীর নামে। দুটি নামকরণ করেছে মেহেরপুর পৌরসভা।

মেহেরপুর থানার কাছে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে মাহাতাব খান সড়ক। মাহাতাব খান ছিলেন মেহেরপুর জেলা পিস কমিটির চেয়ারম্যান। মার্কেটের ভাড়াটিয়াদের কাছে সবদার আলী মার্কেটের নামেই রসিদ দিয়ে ভাড়া আদায় করে পৌরসভা।

মেহেরপুর পৌরর্সভার মেয়র ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘সাবেক পরিষদের সিদ্ধান্তে এই নামকরণ করা হয়েছিল। আগামীতে পরিষদের সভায় নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মেহেরপুরমেহেরপুরের মুজিবনগরের আনন্দবাসে গিয়ে দেখা যায়, ‘মিয়া মনসুর একাডেমি’র নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী মিয়া মনসুরের নামে। মুক্তিযুদ্ধে মিয়া মনসুরের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। মিয়া মনসুর ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের আরেক গভর্নর মেহেরপুরের পাশের জেলা চুয়াডাঙ্গার আবদুল মোতালেব মালিক ওরফে ঠ্যাটা মালিকের বিশ্বস্ত সহচর। মিয়া মনসুর ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে দুইবার চুয়াডাঙ্গা থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন।
মুজিবনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. হাসনাইন করিম বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মিয়া মনসুর একাডেমির নাম পরিবর্তনের জন্য একটি চিঠি এসেছিল। তার আলোকে একটি নাম প্রস্তাব করে পাঠানো হয়েছে। সেটি এখনও অনুমোদন হয়ে আসেনি।’

২০১৪ সালে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবির হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করেন। একই বছর ১৪ মে আদালত সব স্থাপনা থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম প্রত্যাহারের আদেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

জেলা আওয়ামী লীগও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি জেলার স্থাপনাগুলো থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম প্রত্যাহারে।

সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বশির আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় ইতিহাসে মেহেরপুরের মুজিবনগর স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার। ইতিহাসের এ জনপদে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে এখনও পর্যন্ত একাধিক চিহ্ন প্রতিষ্ঠিত।’