তবে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ও তার বাবা বলছেন, এই দুই ড্রেজার থেকে তারা লাভ করতে পারছেন না। বরং একটি ড্রেজারের মেরামত কাজেই তাদের খরচ হয়েছে তিন কোটি টাকার বেশি।
আর স্থানীয় ড্রেজার বিভাগ বলছে, বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দফতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে তাদের কিছুই করার নেই।
ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়ার ঘাঘর নদীতে গিয়ে দেখা যায়, পাউবো’র দুই ড্রেজারের মধ্যে এস ডি কপোতাক্ষ ড্রেজারটি নদীতে নোঙর করা রয়েছে। লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সেটি মেরামতের কাজ করছেন। আর এস ডি ভদ্রা ড্রেজারটি ড্রেজিংয়ের কাজে নিয়োজিত। স্থানীয়রা বলছেন, কপোতাক্ষ ড্রেজারটি মাঝে-মধ্যে খননের কাজ করে, কখনও মেরামতের জন্য খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়। ড্রেজার দু’টিতে নতুনভাবে রঙ করা হয়েছে, মুছে ফেলা হয়েছে আগের নাম। ড্রেজার দু’টি মেহেদী হাসানের বাবা স্থানীয় উপজেলার চেয়ারম্যান মুজিবর রহমান হাওলাদার কিনে এনেছেন বলে জানেন স্থানীয়রা।
পাউবো ও ড্রেজার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার দক্ষিণ মুগদাপাড়ার ঠিকানায় মেসার্স হাওলাদার কন্সট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসান ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর পাউবো মহাপরিচালক বরাবর দু’টি ড্রেজিং ভাড়া নেওয়ার আবেদন করেন। ঘাঘর নদী খননের জন্য তিনি সরকারি নিয়ম মেনে ড্রেজার দু’টি ভাড়া নেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। আবেদনপত্রে নিজ অর্থায়নে ড্রেজার দু’টি চালু করবেন বলেও জানান তিনি।
আবেদনের পর কোনও চুক্তিপত্র ছাড়াই ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ড্রেজার পরিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কে এম নূরুল ইসলাম ড্রেজার দুটি হাওলাদার কন্সট্রাকশনকে ফ্লোটিং পাইপ, সোর পাইপ ও আনুষঙ্গিক মালামালসহ অবিলম্বে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। এই আদেশের পর ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ড্রেজার দুটি খুলনা থেকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় নিয়ে যায় হাওলাদার কন্সট্রাকশন।
এরপর ড্রেজার দুটির ভাড়া পরিশোধ বা চুক্তিপত্র সই করার জন্য খুলনা ড্রেজার বিভাগ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও সেই চুক্তিপত্র সই হয়নি। গত ২৮ জুন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সালাম খানের সই করা এক চিঠিতেও চুক্তিপত্র সই করার অনুরোধ করা হয়। একইসঙ্গে ড্রেজারের ভাড়ার প্রথম কিস্তির টাকাও পরিশোধ করতে বলা হয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।
এর মধ্যে পাউবো’র ড্রেজার বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান শামসুদ্দিন আহমেদ। তিনি উদ্যোগ নিয়ে ড্রেজার দুটি ভাড়া নেওয়ার ১০ মাস পর গত ১ আগস্ট হাওলাদার কন্সট্রাকশনের সঙ্গে চুক্তি সই করেন। চুক্তিপত্রে প্রথম পক্ষে সই করেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সালাম খান, সাক্ষী ছিলেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. গোলাম নবী ও খান মো. আব্দুস সালাম। আর দ্বিতীয় পক্ষে লিজ নেওয়া হাওলাদার কনস্ট্রাকশনের পক্ষে সই করেন স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসান, সাক্ষী ছিলেন মেহেদী হাসানের বাবা মুজিবর রহমান হাওলাদার ও ক্ষিতীশ দত্ত নামের আরেকজন।
শামসুদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চুক্তিপত্রে এস ডি কপোতাক্ষ ড্রেজাটির জন্য বছরে (ভ্যাটসহ) দুই কোটি ৭৯ লাখ ৮২ হাজার ৮০ টাকা, পাইপ ভাড়া ৬৪ হাজার ৫১২ টাকা এবং এস ডি ভদ্রা নামে অন্য ড্রেজারটি বাবদ বছরে ৭৯ লাখ ২৮ হাজার ২৫৬ টাকা ও পাইপ ভাড়া ৬২ হাজার ৫১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।’ ড্রেজার নেওয়ার প্রায় ১০ মাস পর চুক্তি সই হলেও মেলেনি ভাড়ার টাকা।
চুক্তিপত্র অনুযায়ী, ড্রেজার পরিচালনার দায়িত্বে থাকার কথা পাউবো কর্মীদের। তাদের বেতন-ভাতাও লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানেরই বহন করার কথা। কিন্তু এই দুই ড্রেজার পরিচালনায় পাউবোর কোনও কর্মী কাজ করছেন না। ড্রেজারের ভাড়ার মতো এসব কর্মীদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করছে না হাওলাদার কন্সট্রাকশন। ফলে পাউবোর ড্রেজারকর্মীরা খুলনা অফিসে বসে সময় কাটাচ্ছেন। আর তাদের বেতন-ভাতাও বহন করতে হচ্ছে পাউবোকেই।
ড্রেজার বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. গোলাম নবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ড্রেজার দু’টি কেজিডিআরপি প্রকল্পের আওতায় ভবদাহ খনন কাজের জন্য আনা হয়েছিল। সে কাজ শেষ হওয়ার পর তা লিজ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘চুক্তিপত্রে কাজের তফসিল অনুযায়ী ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এক বছর। সে হিসাবে ড্রেজার ব্যবহারের সময়সীমা ২০১৭ সালের নভেম্বর শেষ হয়েছে।’ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দফতর থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা হয়। আমরা কেবল নির্দেশনা অনুসরণ করে থাকি।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদী হাসানের বাবা মুজিবর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাউবোর ড্রেজার বিভাগের লোকেরা কেউই ড্রেজারে থাকে না। আমাদের নিজেদের লোকজনই ড্রেজার পরিচালনা করে।’
ড্রেজারের ভাড়া না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজ খরচে ড্রেজার দু’টি নিয়ে এসেছি। ড্রেজার দু’টি আনার পর এদের একটির পেছনেই মেরামত বাবদ তিন কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদী হাসান মুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০১৫ সালে তিনি ছাত্রলীগ সভাপতি হয়েছেন। পরে গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও হয়েছেন। ঠিকাদারির ব্যবসা করেন এরও আগ থেকে। তিনি বলেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমি ব্যবসা করি। কিন্তু ড্রেজার দু’টি লিজ নিয়ে আমি কোনও লাভ করতে পারিনি।’
ড্রেজারের ভাড়া না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ড্রেজার খুলনায় অকেজো অবস্থায় পড়েছিল। আমার প্রয়োজনে আবেদন করলে তা নিজ খরচে মেরামত করে কাজ করতে হবে বলে জানানো হয়। মেশিনটি চালু হলে ভাড়া নির্ধারণ করার কথা ছিল। কিন্তু ড্রেজারটি নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মেরামত কাজই চলছে। এখন পর্যন্ত চালু করাই যায়নি। ফলে ভাড়া নির্ধারণ করাও হয়নি।’
যদিও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ড্রেজার সচল, অচল বা মেরামতাধীন— যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তিন মাস পরপর ভাড়া পরিশোধের শর্ত উল্লেখ রয়েছে চুক্তিপত্রে।
চুক্তিপত্র সই বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, ‘চুক্তি করা প্রয়োজন ছিল। তাই দেরিতে হলেও চুক্তি হয়েছে। সেখানে মেশিন চালু হওয়ার পর ভাড়ার বিষয়টি কার্যকর করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।’
পাউবোর জনবল না নেওয়া ও তাদের বেতন না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মেশিন চালু না হলে পাউবোর জনবল কোথায় কী কাজ করবে? চালু হওয়ার পরই তো তাদের কাজ। ড্রেজার চালু না করেই জনবল নিয়ে কী করবো?’ ড্রেজার যেহেতু চালুই করা যায়নি, তাই ভাড়ার জন্য চাপ দেওয়ার সুযোগ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘অকেজো ড্রেজার এনে সংস্কার করতে গিয়ে আমি নিজেই বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’