গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কিশোরদের মধ্যে একটু সিনিয়রদের গ্রুপটি ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ নামে পরিচিত। মাদক বিক্রি ও সেবনসহ ছিঁচকে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিশোর গ্রুপ ‘টিপসি বয়েজ’ নামে পরিচিত। এ গ্রুপের সদস্যরা বেশির ভাগই বস্তি এলাকার। আর স্কুলপড়ুয়াদের আরেকটা গ্রুপের নাম ‘গোল্ডেন বয়েজ’। ডেঞ্জার বয়েজ ও গোল্ডেন বয়েজ গ্রুপটি পরিচালিত হয় মহানগরীর বৈকালী বাজার এলাকা থেকে। আর টিপসি গ্রুপটি পরিচালিত হচ্ছে মহানগরীর বয়রা পালপাড়া এলাকা থেকে।
গোয়েন্দারা আরও জানান, ছোট ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে এখন খুনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে কিশোরদের এই গ্রুপগুলো। ২০ জানুয়ারি খুলনা পাবলিক কলেজে কনসার্ট চলাকালে সমবয়সী বন্ধুদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ফাহমিদ তানভির রাজিন নিহত হয়। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর রাতে বন্ধুদের হাতে খুন হয় রূপসা হাইস্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম। এছাড়া মহানগরীর আরও বেশ কয়েকটি স্কুলে বখাটে যুবকদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এ সব কিশোরদের দিয়েই এখন এলাকায় অধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
২০ জানুয়ারি রাজিন হত্যার পর গ্রেফতার হয় সাব্বির, রিফাত ও রিজভি। এদের মধ্যে রিফাত ও রিজভি ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ গ্রুপের সদস্য। আর সাব্বির ‘গোল্ডেন বয়েজ’ গ্রুপের। এখনও পলাতক থাকা ফাহিমও ‘গোল্ডেন বয়েজ’ গ্রুপের অন্যতম সদস্য। হত্যাকাণ্ডের পর র্যাবের হাতে আটক হয়ে রয়েল ও মিতুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ সব তথ্য জানায়। পরে র্যাব ও পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে অন্যরা।
রাজিন হত্যার ব্যাপারে র্যাব-৬ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, ‘রয়েল ও মিতুলের সঙ্গে প্রথম বিরোধ হয় ‘গোল্ডেন বয়েজ’ গ্রুপের কিশোরদের। এরপর তাদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এই হামলার ঘটনার জের ধরেই খুলনা পাবলিক কলেজের ছাত্র রাজিনকে হত্যা করা হয়। পলাতক থাকা ফাহিম পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’
রাজিন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাজিন হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি মুজগুন্নী আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর রোডের বাসিন্দা মো. ফারুক হোসেনের ছেলে মডেল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ফাহিম ইসলাম মনিকে (১৩) গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে গত সোমবার (২২ জানুয়ারি) মহানগর হাকিম শহীদুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে আপন (১৪), রিজভী (১৩) ও আলিফ (১৬)। তারাসহ অন্য আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাথমিক তদন্তে ১৫ থেকে ২০ জন কিশোর অপরাধীর নাম জানা গেছে। তাদের ব্যাপারে পুলিশ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।’
এদিকে বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) খুলনার নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোসাম্মাৎ দিলরুবা সুলতানার আদালতে জামিন পেয়েছে রাজিন হত্যা মামলার আরও তিন আসামি। এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাত জনের মধ্যে পাঁচ জনই জামিন পেয়েছে। বাকি দু’জন রয়েছে যশোর কিশোর সংশোধনাগারে। বৃহস্পতিবার জামিন পেয়েছে রিজভি (১৩), আলিফ (১৬) ও জিসান খান (১৩)। বুধবার (২৪ জানুয়ারি) একই আদালত থেকে জামিন পেয়েছে আপন (১৪) ও মিতুল (১৪)। বর্তমানে কারা হেফাজতে রয়েছে সাব্বির (১৬) ও রয়েল (১৪)।
এর আগে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রূপসা হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী খলিলুর রহমান সিয়ামকে (১৫) খুন করা হয়। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্তরা স্থানীয় একটি ছোট গ্রুপের সদস্য। এ মামলার আসামিদের মধ্যে খ্রিস্টানপাড়ার গোলদারের ছেলে রনি ওরফে বড় রনিকে (২৭) পুলিশ বুধবার (২৪ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে। তাকে ২৫ জানুয়ারি রাতে খুলনায় আনা হয়েছে। এ মামলার অন্য আসামিরা হলো টুটপাড়া দারোগাপাড়া এলাকার বাবুর বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. ইউসুফ খানের ছেলে রায়হান খান (১৭), টুটুপাড়া খ্রিস্টানপাড়ার বাবুলের ছেলে নয়ন (১৬), চাঁনমারী মেসের সড়কের মহারাজের ছেলে রাসেল (১৮), সামাদ গ্রেডারের বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. হানিফের ছেলে রাব্বি (১৮), টুটুপাড়া মেইন রোড হাবিবা মঞ্জিলের বাসিন্দা আলাউদ্দিন মৃধার ছেলে মো. আবু সাইদ ওরফে ছোট (১৬), টুটপাড়া লতা স্টোর গলির বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলামের ছেলে আলামিন হোসেন রনি ওরফে ছোট রনি (১৮), দারোগাপাড়া এলাকার প্রত্যুষ (১৮) ও দারোগাপাড়া হাসিবের বাড়ির ভাড়াটিয়া ওসমান(১৭)।
হত্যার মতো ঘটনায় কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম এম মুজিবর রহমান বলেন, ‘অপরাধের বিভিন্ন স্তরেই এখন কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের প্রচলিত আইনে কিশোরদের কঠিন শাস্তির বিধান না থাকার কারণেই গডফাদাররা এখন কিশোরদের কাজে লাগাচ্ছে। ১৮ বছরের কম বয়স হওয়ার কারণে এদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। সেখানে কারাগারের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় থাকতে পারে তারা। হত্যা মামলায় কিশোরদের সাজা সর্বোচ্চ ১০ বছর। আবার কিশোর অপরাধীরা জামিনও পাওয়া যায়। এসব কারণেই দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। এর পেছনে বিভিন্ন মহলের উসকানিও আছে।’
কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান বলেন, ‘ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় সন্তানদের প্রতি অভিভাবকরা যথাযথভাবে নজর রাখতে পারছেন না। এই সুযোগে অপরাধ সিন্ডিকেটের প্রধানরা কিশোরদের ব্যবহার করছে।’ অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামাজিক অনুশাসন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও মানবিক শিক্ষার বিস্তার ঘটালে এ সমস্যা রোধ করা যাবে বলেও মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন- ‘রাজিনকে ছুরি মারে সাব্বির, অন্যরা কিলঘুষি দেয়’