সুন্দরবনে অবাধে চলছে পারশে পোনা নিধন

পারশে পোনাসুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে অবাধে চলছে পারশে মাছের পোনা নিধন। মৎস্য প্রজনন এলাকা বা নিষিদ্ধ বনাঞ্চল ও বনের বিভিন্ন নদ-নদীতে নেটজাল দিয়ে পোনা ধরতে গিয়ে শতাধিক প্রজাতির জলজ সম্পদ নষ্ট করারও অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পোনা নিধনকারীরা প্রথমে সাদা মাছ পরিবহনের জন্য ট্রলারের অনুমতি নেয়। এরপর সাদা মাছ আহরণের বদলে তারা সুন্দরবনের আলোর কোল, দুবলার চর, বাটলুরচর, ছাচানাংলা, পশুর, আগুন জ্বালা, কালির চর, গেড়া চালকি, বজবজা, হংসরাজ, আন্দারমানিক, ঢাংমারী, ছিচখালী ও মজ্জত নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পারশে মাছের নিষিদ্ধ পোনা আহরণ করে। এক্ষেত্রে মনো ফিলামেন্ট নেট ব্যবহার করায় পারশে পোনাসহ নিধন হচ্ছে বাগদা, গলদা ও বিভিন্ন প্রজাতি মাছের  পোনা।

পশুর নদী ওয়াটার কিপারের (সুন্দরবনকেন্দ্রিক পেশাজীবী সংগঠক) সমন্বয়কারী মো. নুর আলম শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, একশ্রেণির মহাজন অতিরিক্ত মুনাফার লোভে গরিব জেলেদেরকে হাজার হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে পোনা নিধনের জন্য সুন্দরবনে পাঠায়। গোন চুক্তিতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এতে সহযোগিতা করছে কতিপয় বনকর্মকর্তা-কর্মচারী। তাই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পূর্ব সুন্দরবনের ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা আবুল কাশেম। তিনি দাবি করেন, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অসাধু জেলেরা নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে এ পোনা নিধন করছে।

পূর্ব সুন্দরবনের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) শাহীন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতরে সব ধরনের মাছের পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।  জেলেরা বনবিভাগের অফিস থেকে সাদা মাছের পারমিট নিয়ে অবাধে পোনা নিধন চালিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাচ্ছি। তারা ক্ষুদ্রনেট দিয়ে ছাকনির মাধ্যমে পোনা আহরণের ফলে শুধু পারশে পোনা ধ্বংস হচ্ছে না, সমুদ্রের হাজার হাজার প্রজাতির জলজপ্রাণিও ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া পারশে পোনা অন্যান্য প্রজাতির পোনার চেয়ে নরম প্রকৃতির হওয়ায় নেট জাল থেকে অন্য পাত্রে রাখার সময় অর্ধেকের বেশি মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘অবৈধ পোনা শিকারিদের আটকে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে জালএদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, দ্রুতগামী ট্রলারের মাধ্যমে প্রতিটি দলে ৮/১০ জন জেলে দুশ’-তিনশ’ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪০-৫০ মিটার প্রস্থ নেট জালের মাধ্যমে প্রতি টানায় কয়েক মন বিভিন্ন প্রজাতির পোনা ধরে নষ্ট করছে। এভাবে ২০-২৫টি দল প্রতিদিন পোনা শিকার অব্যাহত রেখেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিরা সুন্দরবনে অভিযানে আসলে অসাধু বনকর্মচারীরা আগেই জেলেদের জানিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ জেলেরা বনের মধ্যে পালিয়ে থেকে অভিযান শেষ হলে আবারও পোনা ধরতে থাকে।

পরিবেশবিদ ড. মিজানুর রহমান জানান, এভাবে পোনা শিকার করায় সুন্দরবনের জলজসম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে সামদ্রিক মৎস্য সম্পদ কমে দেশে আমিষের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দফতর) এর জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মিনারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন এলাকায় পারশে মাছের পোনা ধরার খবরে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সুন্দবনের সন্ধ্যা নদীতে অভিযান চালিয়ে পাঁচ লাখ পারশে পোনা, এক লাখ শ্রীম্পফ্রাই জাল ও একলাখ কারেন্ট জালসহ চন্নু শেখ নামে এক জেলেকে আটক করা হয়।’

তিনি জানান, গত ১০ জানুয়ারি থেকে কোস্টগার্ড জাটকা রক্ষা অভিযান পরিচালনা করছে। কোস্টগার্ডের আওতাভুক্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মা ইলিশ ও জাটকা নিধনরোধে কোস্টগার্ড জিরো ট্রলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে বলে জানান সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।