উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের কারণে মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফেথাই’র প্রভাবে মঙ্গলবার (১৮ ডিসেম্বর) দিনভর মোংলা বন্দরসহ উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হওয়া বয়ে যাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করায় বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহণ কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারী মেসার্স মায়া এন্টারপ্রাইজের মালিক আহসান হাবিব হাসানসহ অন্য ব্যবসায়ীরা এ কথা জানান।
অন্যদিকে গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও কুয়াশাসহ বৈরী আবহাওয়ায় কারণে সুন্দরবনের সাগর উপকূলে বিভিন্ন জেলে পল্লীতে শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। সাগর থেকে আহরিত কাঁচা মাছ শুকাতে না পারায় কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়ে পঁচে গেছে বলে জানান জেলে ও মহাজনরা।
দুবলা ফিসারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন,‘মাছ শুকাতে না পারায় এরইমধ্যে প্রচুর মাছ নষ্ট হয়ে বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে দুবলা জেলে পল্লীর জেলে-মহাজনরা।’
তিনি আরও বলেন,‘সাগর থেকে মাছ ধরে জেলে পল্লীতে আনার পর রোদের অভাবে তা শুকানো যাচ্ছে না। যে কারণে বিপুল পরিমাণ মাছ নষ্ট হয়ে পঁচে যাচ্ছে। এ ছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছ ধরার কাজেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি এবং ঢেউয়ের কারণে নৌকা ও ট্রলার চালকরা দিক হারিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করেছে। কিন্তু মাছ শিকার করতে পারছে না। এ অবস্থায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক দুবলার চরসহ আশপাশের মৎস্যজীবী ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার উপরে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে তিনি জানান।
সুন্দরবন বিভাগ জানায়, প্রতি বছর সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন উপকূলের গভীর সমুদ্রে হাজার হাজার জেলে মাছ শিকার করে। পরে এ সব মাছ সুন্দরবনের দুবলার চরসহ আশপাশের চর এলাকায় রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। এরপর এ শুটকি চট্রগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে রফতানি করা হয়।
দুবলারচরের মেহের আলী চরের মৎস্যজীবী ও শুঁটকি ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, তারা চলতি মৌসুমে সাগরে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়া করার জন্য লাখ লাখ টাকা লগ্নি করেছেন। কিন্তু গত দু’দিন ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে শুঁটকি তৈরি করা যাচ্ছে না।’ আজও (১৮ ডিসেম্বর) বৃষ্টি হচ্ছে।
জেলে ও মহাজন সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে এ বছর ১০-১৫ হাজার জেলে ও মৎস্য আহরণকারী জড়ো হয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চর, মেহেরআলীর চর, আলোরকোল, অফিসকিল্লা, মাঝেরকিল্লা, শেলার চর ও নারকেলবাড়িয়া চরে। সুন্দরবন অভ্যন্তরে ছয়টি মৎস্য আহরণ, শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র নিয়ে এ দুবলা জেলে পল্লী।
বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান বলেন,‘এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এবার এ খাত থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় অনেক কমে যেতে পারে।’
এদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফেথাই’র প্রভাবেও গত দুই তিন দিন ধরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে এ এলাকায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। আবহাওয়া অফিস আরও জানায়, ঘূর্ণিঝড় ফেথাই ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ এলাকায় দুর্বল হয়ে প্রথমে নিম্ন চাপ এবং পরে লঘুচাপে রুপ নিয়েছে। এর প্রভাবেই এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এদিকে মঙ্গলবারও ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বলবৎ থাকায় বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদে অবস্থান করছেন বলে বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।