জানা যায়, ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কেসিসির জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প’ এবং ৬০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘খুলনা সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন’ প্রকল্প আগেই একনেকে অনুমোদিত হয়। ২০১৮ সালের ২৭ জুন প্রকল্প দুটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। কেসিসির ইতিহাসে এ দুটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর আগে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে আগামী সপ্তাহে দরপত্র আহ্বান করার প্রক্রিয়া চলছে।
কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আ. আজিজ জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকালে ঢাকা প্ল্যানিং কমিশন অফিসে খুলনার ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আধুনিক খুলনা গড়ে তুলতে নতুন নকশায় নতুন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের নামকরণ করা হয় ‘খুলনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। ব্যয় ধরা হয় ৩৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি প্রি-একনেকে পাস হয়েছে। পাইপ লাইনে থাকা এ প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করবে কেসিসি। ব্যয়ের খাত অনুযায়ী প্রকল্প প্ল্যানিং কমিশনে পাঠানো হবে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয়ে আসার পর একনেকে পাস হবে। এ বছরের শেষে এ প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পের অধীনে থাকছে প্রতিটি মার্কেটের বর্জ্য নেওয়ার জন্য কন্টেইনার বহনকারী গাড়ি, ময়ূর নদ ও আলোচিত ২২ খাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য যন্ত্রপাতি, হাউজ টু হাউজ ময়লা কালেকশনের জন্য থাকবে মিনি ড্রাম ট্রাক, থাকছে লং এক্সক্যাভেটর, বর্জ্য অপসারণ, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারকরণে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি। মানববর্জ্য জ্বালানি তেলে রূপান্তর করতে আধুনিক প্রক্রিয়া, সংগৃহীত ময়লা ডাম্পিং করার জন্য অধিগ্রহণ করা হবে ২৫ একর জমি, গ্যারেজের জন্য ১০ একর এবং ১৫টি এসটিএস-এর জন্য পাঁচ শতাংশ করে ৭৫ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হবে। মেডিক্যাল ওয়েস্ট সংগ্রহ এবং তা প্রক্রিয়াজাত করে আয়বর্ধক পণ্যে পরিণত করা হবে।
চিফ প্ল্যানিং অফিসার আবির উল জব্বার বলেন, ‘প্রকল্পের ডিপিপি করার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এখানে অনুমোদনের পর একনেকে পাঠানো হবে। তবে আগামী মে/জুন নাগাদ প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে দেখা যাবে বলে আমি আশাবাদী। ময়ূর নদের পানি প্রবাহ ঠিক রেখে তা পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা এ প্রকল্পে রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খুলনা শহরের পরিবেশ হবে বিশ্বের অন্য আধুনিক শহরের মতো।’
এদিকে, খুলনা নগরীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সরকার আগেই ৮২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পের নামকরণ হয় ‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম ধাপ)’। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে এ প্রকল্প অনুমোদন হয়। এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির অধীনে প্রাইমারি ড্রেন ৬২ কিলোমিটার, সেকেন্ডারি ড্রেন ১২৯ কিলোমিটার, খাল খনন ও পাড় বাঁধাই ২৭ কিলোমিটার, একটি পাম্প হাউজ ও ময়ূর নদের ওপর তিনটি ব্রিজ, আটটি স্লুইসগেট, অল্প কিছু জমি অধিগ্রহণ, কিছু যানবাহন ক্রয় করা হবে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের কনসালট্যান্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। থার্ড পার্টি কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (কুয়েট)। তারা প্রকল্পের কনসালট্যান্টদের কাজ তদারকি করবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ২০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। ড্রেনগুলোর মধ্যে আহসান আহমেদ রোড, সামসুর রহমান রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, গগন বাবু রোড, খানজাহান আলী রোড, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ড্রেন উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগ ড্রেন গিয়ে মিলিত হবে ময়ূর নদে। এসব ড্রেনের ড্রইং ও নকশা সম্পন্ন হয়েছে। কাজ শুরু হলে তা দ্রুত সম্পন্ন হবে।
কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘শিগগিরই এই প্রকল্পের কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ইতোমধ্যে কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কনসালট্যান্টদের কাজ সুপার ভিশন করবে কুয়েটের একটি টিম।’ তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে পারছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টেন্ডার আহ্বান করা হলে ড্রেনের কাজ শুরু হবে। তখন পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে না।’
উল্লেখ্য, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৯৮৪ সালে এটি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আয়তন ৪৫.৬৫ বর্গকিলোমিটার এবং বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন তালুকদার আবদুল খালেক। তার সময়ে ৯৭৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। যার পুরোটা তার মেয়াদকালে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কিছু কাজ চলমান থাকে। তৎকালীন মেয়র মনিরুজ্জামান মনি ওইসব প্রকল্পের কিছু কাজ শেষ করেন। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত মেয়র মনি ১১৩ কোটি টাকার কাজ করেছেন।