শাহীন চাকলাদারের ফোনালাপ ফাঁস  

নিরাপত্তা চেয়ে পরিবেশকর্মী সাইফুল্লাহর জিডি

যশোরের কেশবপুর (যশোর-৬) আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের ফোনালাপ ফাঁসের পর নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী শেখ সাইফুল্লাহ। ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপে সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘ডাকাতির উদ্দেশে বোমা হামলা’ মামলা করতে স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশনা দেন শাহীন চাকলাদার।

শনিবার (৩০ জানুয়ারি) কেশবপুর থানায় এই জিডি করেন সাইফুল্লাহ। এতে তিনি নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে, নিরাপত্তা দিতে সংশ্লিষ্ট থানায় আবেদন করেন।

জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ‘একটি অনলাইন সংবাদপত্রের মাধ্যমের খবরে জানতে পেরেছি সংসদ সদস্য শাহিন চাকলাদার কেশবপুর থানার ওসিকে মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্য মোবাইল ফোনে চাপ প্রয়োগ করেছেন। কেশবপুর থানার সাতবাড়ীয়া গ্রামে অবস্থিত সুপার ব্রিক্স নামক একটি ইটভাটা রয়েছে। যার লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় এবং পরিবেশ দূষণ করায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী বিভিন্ন সরকারি দফতরে প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়। পরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) কাছে আইনি সহায়তা চায়। এরপর তাদের সহায়তায় হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মূলক মামলা দায়ের করেন।’

জিডিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘উভয়পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ইট ভাটাটি অপসারণের নির্দেশ দেন। পরে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর সেটি অপসারণ করা হয়। অনলাইন সংবাদপত্রে ফোনালাপ ফাঁসের খবর পড়ে আমি বর্তমানে জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

প্রসঙ্গত, সপ্তাহ দুয়েক আগে কেশবপুর থানার ওসি জসিম উদ্দিনের মোবাইল ফোনে কল করে চাকলাদার এই নির্দেশনা দেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় ‘মেসার্স সুপার ব্রিকস’ নামে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন সাইফুল্লাহ। আদালত ভাটা বন্ধের নির্দেশনাও দেন। আর এতেই ক্ষিপ্ত হন সাংসদ শাহীন চাকলাদার।

ওই ফোনালাপে সংসদ সদস্য নিজেকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে ওসি জসিম উদ্দিনকে বলেন, ‘আপনি রাতেই থানায় বোম মারেন। তারপর সাইফুলের নামে মামলা করেন।’ এরপর বলেন, ‘পুলিশকে সিভিল কাপড়ে পাঠিয়ে ইটভাটায় বোমা মেরে ডাকাতির উদ্দেশে হামলা এমন একটা মামলা দেন। মামলা করতেই হবে, এটাই শেষ কথা।’

সম্পূর্ণ ফোনালাপটি বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

যশোরের এমপি শাহিন চাকলাদারের সঙ্গে কেশবপুর থানার ওসির ফোনালাপ

‘থানায় বোম মারেন একটা, মারায়ে মামলা করতে অইবে’

ওসি: স্লামালাইকুম স্যার।

শাহীন চাকলাদার: ঘুম?

ওসি: না স্যার। ঘুমাইনি স্যার।

শাহীন চাকলাদার: সাতবাড়িয়ার সাইফুল্লাহ কেডা?

ওসি: সাতবাড়িয়া...সাইফুল্লাহ আছে, স্যার ওই বেটার একটা বিষয় নিয়ে সাইফুল্লাহ, বেলায় যে মামলা টামলা করে আরকি, বাজে একটা ছেলে স্যার।

শাহীন চাকলাদার: সাইফুল্লাহ..আপনি এখন রাত্রি থানায় একটা  বোম মারেন একটা। মারায়ে ওর নামে মামলা করতে হইবে। পারবেন? (ফাঁকে ওসি স্যার বললেন) আপনি থাকলে এগুলো করতে অইবে। না অইলে কোন জায়গায় করবেন? আমি যা বলছি, এডা লাস্ট কথা ইডাই। যদি পারেন ওই এলাকা ঠান্ডা রাখতি, আমি বন ও পরিবেশ বিষয়ক ইস্থায়ী (স্থায়ী) কমিটির সদস্য। ওখানে কারও বাপের ক্ষমতা নেই। এ্যাঁ বারবার যেয়ে কেন করে, আপনি কী করেন?

ওসি: ও তো স্যার হাইকোর্টের কাগজ নিয়া আসে বারবার।

শাহীন চাকলাদার: আরেহ..কোথার হাইকোর্ট-ফাইকোর্ট। কোর্টফোর্ট যা বলুক, বলুইগ্যা। অন্য...আমাদের খেলা নাই? খেলা নাই?

ওসি: হাইকোর্টে স্যার......

শাহীন চাকলাদার: ওসি হলি, ওসি কিন্তু ডায়নামিক হইতে অয়। আজকে বাগারপাড়া ওসি আসছিলো আমার কাছে। ওরে আবার চৌগাছায় দিয়ে দিচ্ছি আবার। ও ওসি..চেনেন? বাগাড়পাড়া ওসিকে চেনেন?

ওসি: চিনি না স্যার? মামুন সাহেবরে?

শাহীন চাকলাদার: কথা বইলেন, তার সাথে। তাকে নিয়ে আসতেছি চৌগাছায়। আপনে ওকে যেকোনও ভাবে, যেকোনও লোক দিয়ে, কাইলকে যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটায়ে কালকে কাজটা করেন, ওকেহ?

ওসি: স্যার, দেখি স্যার। কি হয়েছে স্যার। ওর কি ডিস্টার্ব করতেছে আবার?

শাহীন চাকলাদার: ও কী ডিস্টার্ব করবে। আচ্ছা, বন ও পরিবেশ অফিসে আমি আছি। কার বাপের ক্ষমতা আছে এখানে আসবে। আমি বলছি কী, একটা আপনি খেলা খেলে ওকে ভেতরে নিয়ে আসেন। কথা বুঝেন নাই?

ওসি: স্যার, স্যার। দেখবোনে স্যার।

শাহীন চাকলাদার: কেমন অফিসার আপনি আল্লাই জানে। কাজ দিলি কাজ পারেন না।

ওসি: উহমম হাহাহাহা স্যার। সব কাজই তো করি স্যার।

শাহীন চাকলাদার: সব কাজ করেন না? তালিপরে যেকোনও ঢাকায় যেয়ে, দরকার হলি পুলিশের দিয়ে লোক দিয়ে সিভিলে বোম ফাটায় দিয়ে চলে আসুক। বলতে হবি যে, হামলা করেছে ডাকাতি করার জন্য। এটা ছিলো অমুক। একটা বানাই দিলে অয়া গেলো।

ওসি: ও স্যার, ওইযে, ওইযে, বেলার যে কাগজটা আসছে ওডা দেখছেন স্যার, আপনে? হাইকোর্টের কাগজটা।

শাহীন চাকলাদার: বেলাফেলা আমি দেখবোনে, আমি তো স্থায়ী কমিটির সদস্য।

ওসি: হাইকোর্টের কাগজটা স্যার। হাইকোর্ট।

শাহীন চাকলাদার: হাইকোর্টের কাগজে কী বলেছে?

ওসি: রিসেন্টলি, গতকালকে একটা কাগজ আসছে হাইকোর্টের থেকে স্যার।

শাহীন চাকলাদার: কী আছে?

ওসি: আমি দেখাবো নে স্যার কালকে। বা হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দেবোনে আপনারে স্যার। হাইকোর্ট থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা আসছে ওইযে, সুপার ব্রিকস বন্ধ রাখার নির্দেশ দিসে স্যার।

ওসি: হাইকোর্টের.....

শাহীন চাকলাদার: আমাদের এলাকায় স্কুল কলেজ বাদে আমি আমার এলাকায় কোনও ব্রিকস বন্ধ করবো না। যে যেই দিগ্যা। আমি করবো না।

ওসি: কাগজটা তো দেখবেনই স্যার। কী লিখছে স্যার।

শাহীন চাকলাদার: ঠিক আছে, ওকে।

ওসি: আচ্ছা।

ফোনালাপের অডিও-